মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নীরবতা ভাঙতে সংগীতকে প্রতিবাদের হাতিয়ার করে তুলছে মোজাম্বিকের যুবসমাজ
প্রথম প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে Global Voices বাংলা ভার্সন

শান্তিপূর্ণ এক বিক্ষোভে অংশ নেওয়া একদল মানুষ। তাঁদের মধ্যে একজনের হাতে মাইক্রোফোন ও একটি ব্যানার। ছবি: স্টেফানি ডগলাস। নাইজেরিয়া। পেক্সেলস থেকে নেওয়া। পেক্সেলসের লাইসেন্স অনুযায়ী ব্যবহৃত।
মোজাম্বিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। দেশটির সংবিধানের ৪৮ নম্বর অনুচ্ছেদে এই অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে তথ্য অধিকার আইন, ২০১৪ (আইন নং ৩৪/২০১৪)। কিন্তু বাস্তবে দুর্নীতি, বৈষম্য, পুলিশের অত্যাচার কিংবা প্রশাসনের জবাবদিহি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে গিয়ে এখনও ঝুঁকির মুখে পড়তে হয় অনেক তরুণকে। গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি আর মানুষের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার মধ্যে ব্যবধানটা এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সংগীতের জগতে এই বৈপরীত্য বিশেষভাবে চোখে পড়ে। গত দুই দশকে হিপ-হপ শহুরে যুবসমাজের কাছে সামাজিক অসন্তোষ ও প্রতিবাদ প্রকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রাজধানী মাপুতোতে। হিপ-হপ কেবল একটি সংগীতধারা নয়; এটি এমন এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা ও উদ্বেগ তুলে ধরার মাধ্যম, যারা একদিকে নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় রাজনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বহুদলীয় রাজনীতির সূচনা দেখেছে, অন্যদিকে তাদের বড় হতে হয়েছে উচ্চ যুব বেকারত্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং ক্ষমতাসীন ফ্রেলিমো দলের নেতৃত্বাধীন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি ক্রমবর্ধমান অনাস্থার মধ্যে।
গানের কথায় নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জিপিআরও-র মতো সংগীতগোষ্ঠী এবং আজাগাইয়া-র মতো শিল্পীরা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। আজাগাইয়ার ‘ও সিক্লো দা সেনসুরা’ (সেন্সরশিপের চক্র) গানটির প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক: “কে বলেছে, এই দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে?” এটি নিছক কোনো উসকানিমূলক শৈল্পিক মন্তব্য নয়। বরং কে কথা বলতে পারবেন, কী বিষয়ে বলতে পারবেন এবং তার জন্য কী পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে, সেই বাস্তব ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিরই প্রতিফলন।
নাগরিক অংশগ্রহণের নতুন পথ
মোজাম্বিকের যুবসমাজ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রচলিত ধারণা বদলে দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক অংশগ্রহণ বলতে মূলত রাজনৈতিক দল ও সরকারি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকাকেই বোঝানো হতো। কিন্তু এখন সেই পরিসর অনেকটাই বিস্তৃত। উইমেনস ফোরামের মতো নারীবাদী সংগঠন, স্থানীয় প্রশাসনের কাজকর্ম নজরে রাখার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং নানা শৈল্পিক উদ্যোগের মধ্য দিয়েও তরুণরা নিজেদের মতামত ও দাবি তুলে ধরছেন। এই পরিবর্তন এমন এক প্রজন্মের পরিচয় দেয়, যারা রাজনীতিকে শুধু নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। জনপরিসর কীভাবে গড়ে উঠবে, সেই প্রক্রিয়াতেও তারা নিয়মিত অংশ নিতে চায়।
তবে অংশগ্রহণের এই নতুন পথগুলোর সঙ্গে প্রায়ই সংঘাত বাধে প্রশাসনের। এখনও অনেক কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকে জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি বলে মনে করে। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ২০১৬ সালের ঘটনা। সে বছর সরকারি স্কুলে ছোট স্কার্ট পরার ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে পথে নেমেছিল নারীবাদী সংগঠনগুলো। যৌন হয়রানি রুখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল। অথচ এর মধ্য দিয়ে কার্যত ছাত্রীদের পোশাককেই তাঁদের ওপর হওয়া হয়রানির কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়।
অপরাধীদের বদলে মেয়েদেরই দায়ী করার এই প্রবণতা আরও গভীর একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে: নারীর শরীরের ওপর কার নিয়ন্ত্রণ থাকবে এবং তরুণীরা নিজেদের পরিচয় নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারবেন কি না। ওই বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে স্পেনের অধিকারকর্মী ইভা আনাদোন মোরেনোকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে মোজাম্বিক থেকে বহিষ্কারও করা হয়।
নীরব থাকাও এক ধরনের রাজনৈতিক অবস্থান
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোজাম্বিকে সেন্সরশিপ সাধারণত সরাসরি নিষেধাজ্ঞার রূপে দেখা যায়নি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সেখানে ভয় কিংবা নিজের বক্তব্য নিজেই চেপে রাখার প্রবণতা নেই। ২০১০ সালের এক সাক্ষাৎকারে আজাগাইয়া বলেছিলেন, মোজাম্বিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা সব সময় পুলিশের সরাসরি ভয় দেখানো নয়, বরং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। কারণ, অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষমতাসীন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রকাশ্যে সমালোচনা করলে কাজ হারানো কিংবা অন্য বিপদে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এভাবেই তৈরি হয় এক ধরনের ‘নীরবতার অর্থনীতি’। সাংবাদিকেরা কিছু বিষয় এড়িয়ে যান, শিল্পীরা নিজেদের বক্তব্যে লাগাম টানেন, সরকারি কর্মকর্তারা মতামত প্রকাশ থেকে বিরত থাকেন। তরুণ অধিকারকর্মীরাও বুঝতে শেখেন, কথা বলার জন্য বড় মূল্য দিতে হতে পারে। তখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর শুধু আইনি অধিকারের প্রশ্ন থাকে না, হয়ে ওঠে টিকে থাকার প্রশ্ন। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিবাদী সংগীতের গুরুত্বও বেড়ে যায়। এই সংগীত মানুষের জমে থাকা নীরবতা ভাঙে, অন্যায়ের অভিজ্ঞতাকে ভাষা দেয় এবং সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মানুষকে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি শুধুই মরীচিকা?
মোজাম্বিকের সংবিধানে প্রত্যেক নাগরিকের মতপ্রকাশ ও মতামত জানানোর অধিকার স্বীকৃত। কিন্তু গণতন্ত্রের বিচার শুধু সংবিধানে কী লেখা আছে, তা দিয়ে হয় না। মানুষ বাস্তবে কতটা নির্ভয়ে সেই অধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার এই ফারাকই এক ধরনের মরীচিকা তৈরি করে। নাগরিকদের বলা হয়, তাঁরা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারেন। অথচ নজরদারি, সামাজিকভাবে হেয় করা এবং নানা সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার মতো অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে জনপরিসরে কারা অংশ নিতে পারবেন, তা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সব কণ্ঠকে সরাসরি স্তব্ধ করে দেওয়ার দরকার পড়ে না; ভিন্নমত প্রকাশের মূল্য এতটাই ভীতিকর করে তুললেই যথেষ্ট। এর একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় টেলিযোগাযোগ পরিষেবার শুল্ক বৃদ্ধি।
এই পরিস্থিতিতে তরুণদের সক্রিয় ভূমিকার মধ্যেও একই দ্বন্দ্ব দেখা যায়। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক হয়ে থাকা মানুষের কণ্ঠস্বরকে সামনে নিয়ে আসেন, তাঁদের বক্তব্য আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। কিন্তু কোনো শিল্পী, অধিকারকর্মী কিংবা তরুণদের সংগঠন যত বেশি মানুষকে একত্রিত করতে পারে, তাদের ভয় দেখানো, অপতথ্য ছড়ানো কিংবা অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ঝুঁকিও তত বাড়ে।
তরুণদের কণ্ঠস্বর আরও জোরালো হোক
এত বাধা সত্ত্বেও মোজাম্বিকের তরুণ প্রজন্ম রাজনৈতিক আশার নতুন নতুন পথ তৈরি করে চলেছে। শিল্প, সংগীত ও ডিজিটাল মাধ্যমে তাদের সক্রিয়তা দেখিয়ে দিচ্ছে, নাগরিকত্ব শুধু আইনি পরিচয়ের বিষয় নয়। প্রতিদিনের অংশগ্রহণ, নতুন কিছু ভাবার সাহস এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েও নাগরিকত্বের চর্চা হয়। মোজাম্বিকের মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার আসল চ্যালেঞ্জ শুধু সংবিধানে এই অধিকার লিখে রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এমন পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি, যেখানে প্রত্যেকে অর্থনৈতিক, সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক প্রতিশোধের ভয় ছাড়াই নিজের মত প্রকাশ করতে পারবেন। মোজাম্বিকের সামনে তাই মূল প্রশ্ন শুধু এই নয় যে তরুণরা কথা বলতে পারছেন কি না; প্রশ্ন হলো, নিজেদের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান কিংবা জনজীবনে অংশ নেওয়ার সুযোগ বিপন্ন না করেই তাঁরা কথা বলতে পারছেন কি না।





