প্রাকৃতিক দুর্যোগের ছায়ায় দিন কাটে নেপালের মানুষের, অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কই যেন তাঁদের নিত্যসঙ্গী

বিজ্ঞাপন

প্রথম প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে Global Voices বাংলা ভার্সন

নুওয়াকোট জেলার দেবীঘাটে তাড়ি নদীর দুই পাড়ের জনবসতি। ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল, ৭ অক্টোবর ২০২৬

নুওয়াকোট জেলার দেবীঘাটে তাড়ি নদীর দুই পাড়ের জনবসতি। ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল, ৭ অক্টোবর ২০২৬। অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত।

নেপাল যখন নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলিতে আঘাত হানা ভোটেকোশি আকস্মিক বন্যার ধাক্কা সামলে ওঠার চেষ্টা করছে, তার ৪৬ দিন পর, ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর, গোরখার চুমনুব্রিতে ভূমিধসের জেরে আরও এক দফা বন্যা আঘাত হানে। আগের বিপর্যয়ে রাসুয়া ও নুওয়াকোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। নতুন এই দুর্যোগ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকির মধ্যে বসবাসকারী জনসমাজের ক্ষত আরও গভীর করেছে। অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ক যাঁদের নিত্যদিনের সঙ্গী, তাঁদের কাছে প্রতিটি দিনই যেন নতুন করে টিকে থাকার লড়াই।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত এই বিপর্যয়ে নুওয়াকোটের একসময়ের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রের চেহারা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ধ্বংস হয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার নানা সুযোগ। একের পর এক জনবসতি পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোও ভেসে গেছে বন্যার জলে। সরকারি হিসাবে মোট মৃতের সংখ্যা এখনও নিশ্চিত করা হয়নি।

নিজেদের জিনিসপত্র খুঁজতে এখনও দেবীঘাটে আসছেন বেঁচে যাওয়া মানুষজন। নুওয়াকোট জেলার দেবীঘাট। ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল, ৭ অক্টোবর ২০২৬

নিজেদের জিনিসপত্র খুঁজতে এখনও দেবীঘাটে আসছেন বেঁচে যাওয়া মানুষজন। নুওয়াকোট জেলার দেবীঘাট। ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল, ৭ অক্টোবর ২০২৬। অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত।

বিজ্ঞাপন

তবে এই ধ্বংসযজ্ঞের আড়ালে রয়েছে এক অস্বস্তিকর সত্য: এমন বিপর্যয়ে মানুষের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়, তা প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। পরিসংখ্যানের আড়ালে চাপা পড়ে থাকে ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন, হারিয়ে যাওয়া জীবিকা আর স্মৃতির জগৎ। কেউ প্রিয়জনকে হারিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যান, কোনও জনসমাজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় ঢেকে যায়। আবার অনেকে সামান্য যা অবশিষ্ট রয়েছে, তা নিয়েই নতুন করে জীবন গড়ার চেষ্টা করেন। ঘুরে দাঁড়ানো ও পুনর্গঠনের এই লড়াই তাঁদের কাছে সহজ নয়।

পুনর্গঠনের কাজের পরিধি বিশাল। ক্ষতি শুধু বাড়িঘর, রাস্তা ও সেতুর নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষিজমি এবং স্থানীয় ব্যবসাও। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্যের ভিত্তিতে কিয়োডো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭,৫০০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অথবা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। পুনরুদ্ধারের খরচ দাঁড়িয়েছে ৪.৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সরকার এখন জরুরি ত্রাণের পর্যায় পেরিয়ে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের কাজে মন দিয়েছে। একই সঙ্গে হিমবাহ হ্রদের জল উপচে সৃষ্ট বন্যা (গ্লফস) এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকির কথাও স্বীকার করেছে। সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় বেঁচে যাওয়া মানুষজন আরও বিপন্ন হয়ে পড়েছেন। পুনর্গঠনের কাজও ধীর হয়ে পড়েছে, ফলে তাঁদের নতুন করে বিপদের মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কিছু বাড়ি এখনও দাঁড়িয়ে, কিন্তু ঘর ছেড়ে চলে গেছেন বাসিন্দারা। নুওয়াকোট জেলার বিদুর পুরসভা। ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল, ৭ অক্টোবর ২০২৬

কিছু বাড়ি এখনও দাঁড়িয়ে, কিন্তু ঘর ছেড়ে চলে গেছেন বাসিন্দারা। নুওয়াকোট জেলার বিদুর পুরসভা। ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল, ৭ অক্টোবর ২০২৬। অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত।

এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং জরুরি পরিষেবা ফিরিয়ে আনতে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া আর সেই অর্থ বাস্তবে হাতে পাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এক বিষয় নয়। নেপালের অর্থ মন্ত্রকের বিদেশি সহায়তার হিসাব রাখার অনলাইন ব্যবস্থা অনুযায়ী, দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপাল ২৪.৮৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পেয়েছে। কী পরিমাণ সাহায্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কীভাবে তা বণ্টন করা হচ্ছে, সেই তথ্য প্রকাশ্যে রাখলে স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানিয়েছে, নগদ অর্থ, সামগ্রী ও উদ্ধারকারী দল মিলিয়ে ৫০.৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।

দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক অগ্রগতির খবর দেওয়া হয়নি। এখনও পর্যন্ত অধিকাংশ সাহায্য ব্যয় হচ্ছে মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে, যেমন চিকিৎসা, খাবার ও অস্থায়ী আশ্রয়ের জন্য তাঁবুর ব্যবস্থা করতে।

মানুষ ছাড়া বাড়িগুলিকে কী বলা যায়? দাঁড়িয়ে রয়েছেন প্রতিবেদক সুশ্মিতা। নুওয়াকোট জেলার বিদুর পুরসভা। ছবি: মায়া দেবী আরিয়ালের মাধ্যমে সুশ্মিতা আরিয়াল, ৭ অক্টোবর ২০২৬

মানুষ ছাড়া বাড়িগুলিকে কী বলা যায়? ছবিতে প্রতিবেদক সুশ্মিতা আরিয়াল। নুওয়াকোট জেলার বিদুর পুরসভা থেকে ছবি: মায়া দেবী আরিয়ালের মাধ্যমে সুশ্মিতা আরিয়াল, ৭ অক্টোবর ২০২৬। অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত।

অনেক ক্ষতিগ্রস্ত জনপদ এখনও পরিকাঠামো পুনর্নির্মাণ ও জীবিকা পুনরুদ্ধারের সুযোগ থেকে দূরে রয়েছে। ভারত, চিন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (ইউএই) সাহায্য পাঠাচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্কসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানও অর্থসাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবু পুনরুদ্ধারের গতি সব এলাকায় একরকম হবে না বলেই আশঙ্কা। ক্ষতিগ্রস্ত জনসমাজের সামনে এখন শুধু হারানো সম্পদ ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ নয়, জীবিকা ও জনপরিষেবা পুনরুদ্ধার করার পাশাপাশি বারবার ফিরে আসা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কার মধ্যেও নিরাপত্তার অনুভূতি ফিরিয়ে আনার লড়াই রয়েছে।

নিচের ছবির ধারাবাহিকে গ্লোবাল ভয়েসেস তুলে ধরেছে, বিপর্যয়ের প্রভাব কীভাবে এখনও নেপালের সাধারণ মানুষের জীবনে রয়ে গেছে। সব ছবিই ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর নুওয়াকোট জেলার বিদুর পুরসভায় তুলেছেন সুশ্মিতা আরিয়াল।

নুওয়াকোট জেলার বিদুর পুরসভা কার্যালয়ে ত্রাণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর অপেক্ষায় তারা দেবী তামাং এবং অন্যরা। ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল

নুওয়াকোট জেলার বিদুর পুরসভা কার্যালয়ে ত্রাণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর অপেক্ষায় তারা দেবী তামাং এবং অন্যরা। ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল। অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত।

চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। নুওয়াকোট জেলার বিদুর পুরসভা। ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল

নুওয়াকোট জেলার বিদুর পুরসভায় জনপদজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল। অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত।

আধভাঙা আশ্রয়স্থল, যেখানে একসময় ছিল একটি বাড়ি। নুওয়াকোট জেলার বিদুর পুরসভা। ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল

আধভাঙা আশ্রয়স্থল, যেখানে একসময় ছিল একটি বাড়ি। নুওয়াকোট জেলার বিদুর পুরসভা থেকে ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল। অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত।

একসময় কারও গোটা পৃথিবী ছিল যে বাড়ি, আজ তা ধ্বংসস্তূপ। নুওয়াকোট জেলার বিদুর পুরসভা। ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল

একসময় কারও গোটা পৃথিবী ছিল যে বাড়ি, আজ তা ধ্বংসস্তূপ। নুওয়াকোট জেলার বিদুর পুরসভা থেকে ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল। অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত।

জানালার কাচ ভেঙে তৈরি হয়েছে জরুরি পালানোর পথ। নুওয়াকোট জেলার বিদুর পুরসভা। ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল

জানালার কাচ ভেঙে তৈরি হয়েছে জরুরি পালানোর পথ। নুওয়াকোট জেলার বিদুর পুরসভা থেকে ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল। অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত।

প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। নুওয়াকোট জেলার বিদুর পুরসভা। ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল

বিদুর পুরসভায় নদীর ধারে অবস্থিত একটি বাড়ির আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল। অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত।

আরোহীহীন পড়ে রয়েছে একটি হেলমেট। নুওয়াকোট জেলার বিদুর পুরসভা। ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল

আরোহীহীন পড়ে রয়েছে একটি হেলমেট। নুওয়াকোট জেলার বিদুর পুরসভা থেকে ছবি: সুশ্মিতা আরিয়াল। অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত।

(English) ভাষায় লিখেছেন Susmita Aryal
(বাংলা) ভাষায় অনুবাদ করেছেন সৌম্যদীপ দেওয়ানজী
মূল লেখাটি দেখুন (English)