সরকার বদলানোর পর রাষ্ট্রের কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা বদলেছে?
প্রথম প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে Global Voices বাংলা ভার্সন

শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে উল্লাসরত মানুষ। ছবি: মো. জনি হোসেন, উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত। সিসি বাই-এসএ ৪.০ (CC BY-SA 4.0)।
এই পোস্টটি গ্লোবাল ভয়েসেসের সেপ্টেম্বর ২০২৬ এর বিশেষ ধারাবাহিক “গণতন্ত্রে প্রতিবাদ ” (Protest in Democracy) এর অংশ। এই ধারাবাহিকের মাধ্যমে আমরা গণতান্ত্রিক কাঠামোতে প্রতিবাদের বিভিন্ন রূপ ও প্রতিবাদকে দমন করতে রাষ্ট্র যে কৌশলগুলো ব্যবহার করে সেসব উপস্থাপন এবং প্রতিবাদ ও গণতন্ত্রের মধ্যে জটিল সম্পর্ক অন্বেষণ করতে চাই। এ ধরনের আরও প্রতিবেদন প্রকাশে সহায়তা করতে চাইলে এখানে ক্লিক করে অনুদান দিতে পারেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। ঢাকার রাস্তায় মানুষের ঢল। পতন ঘটেছে দীর্ঘদিনের একটি সরকারের। কয়েক সপ্তাহ আগেও যে দৃশ্য কল্পনা করা কঠিন ছিল, সেদিন সেটিই বাস্তব। অনেকের কাছে দিনটি ছিল বিজয়ের- একটি সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বিজয়, রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি দাবি করার বিজয়।
কিন্তু দুই বছর পর, সেই বিজয়ের দিকে ফিরে তাকালে প্রশ্নটি একটু বদলে যায়: আমরা কি শুধু একটি সরকার বদলাতে পেরেছিলাম, নাকি যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, সেটিও বদলেছে?
জুলাইয়ের আন্দোলন শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে আরও বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) হিসাবে, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হন। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন।
সরকারের পতন ছিল আন্দোলনের একটি দৃশ্যমান ফল। কিন্তু আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক মানুষের প্রত্যাশা ছিল তার চেয়েও বড়- রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিবর্তন, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার কাঠামোর সংস্কার।
জুলাইয়ের পর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল
দুই বছর পর জুলাই আন্দোলনের উত্তরাধিকার নিয়ে bdnews24-এর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, আন্দোলনের সময় যে কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছিল, তা বাস্তবে হয়নি।
তার ভাষায়:
People expected reforms across the judiciary, executive and every institution of the state. Instead, the same old structure that repeatedly allows authoritarianism to return has survived.
মানুষ বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সংস্কার আশা করেছিল। কিন্তু যে পুরোনো কাঠামো বারবার কর্তৃত্ববাদী শাসনের সুযোগ তৈরি করে, সেটিই টিকে গেছে।
তবে এই মূল্যায়নের পাশাপাশি অন্য মতামতও আছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান bdnews24-কে বলেছেন,
জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ‘কর্তৃত্ববাদ থেকে মুক্তি’ পেয়েছে, ‘অনেক দিন পর’ মানুষ ভোট দিতে পেরেছে, একটি নির্বাচিত সরকার এসেছে।
নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের একটা বার্তা আমরা পাচ্ছি, কিন্তু ভবিষ্যৎ বলে দেবে, এটা কতটা টেকসই হল। এখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কার্যকর রাখা এবং এটা সক্রিয় করার ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে।
তাঁর মতে, প্রত্যাশা অনুযায়ী পূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি হতে সময় লাগে। অর্থাৎ জুলাইয়ের পর মূল প্রশ্নটি শুধু কে ক্ষমতায় এলেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো, ক্ষমতা পরিচালনার নিয়মগুলো কতটা বদলাল?
দুই বছর পর সংস্কারের হিসাব
মানুষের সেই প্রত্যাশা ও পরবর্তী বাস্তবতার মধ্যে দূরত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায় জরিপেও।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (BIGD) ২০২৪–২৫ সালের তিন দফা পালস সার্ভেতে দেখা যায়, জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কমেছে। আগস্ট ২০২৪-এ দেশের রাজনৈতিক গতিপথকে সঠিক মনে করেছিলেন ৭১ শতাংশ উত্তরদাতা। জুলাই ২০২৫-এ তা নেমে আসে ৪২ শতাংশে। একই জরিপে পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার সংস্কারকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোর মধ্যে রেখেছেন ৫৭ শতাংশ উত্তরদাতা; ৩৮ শতাংশ বলেছেন নির্বাচনী ও সাংবিধানিক সংস্কারের কথা।
অর্থাৎ অনেক নাগরিকের কাছে নির্বাচন ও সরকার পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
কিন্তু সেই সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিয়েই এখন বিতর্ক।
২০২৬ সালের এপ্রিলে আল জাজিরা জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় (আগস্ট ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬) জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশের অন্তত ২৩টি বাতিল হয়েছে বা সময়সীমা পার হয়ে কার্যকারিতা হারিয়েছে। এর মধ্যে মানবাধিকার, বিচারিক তদারকি, দুর্নীতি দমন ও পুলিশ সংস্কারের মতো বিষয়ও ছিল। বিরোধী দল ও কিছু বিশ্লেষক এটিকে সংস্কার পিছিয়ে যাওয়ার লক্ষণ হিসেবে দেখেছেন। সরকার অবশ্য বলেছে, এগুলো সংস্কার বাতিল নয়; বরং আইনগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পুনঃপ্রবর্তনের প্রক্রিয়া।
রাষ্ট্রীয় এই সংস্কারের শ্লথগতি ছাড়াও পুরোনো রাজনৈতিক চর্চার প্রশ্ন উঠেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রতিষ্ঠানে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং প্রশ্নবিদ্ধ র্যাব বিলুপ্ত করে ‘এসআরবি’ গঠনের মতো পদক্ষেপেও বিরোধী দল ও মানবাধিকারকর্মীরা প্রশ্ন তুলেছেন- নাম বা কাঠামো বদলালেও পুরোনো সমস্যার সমাধান কতটা হচ্ছে?
অন্যদিকে, সাইবার আইন বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ ২০২৪-এর আন্দোলনের সময় অনলাইন যোগাযোগ ও মতপ্রকাশও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মুখে পড়েছিল। আন্দোলনের সময় ফেসবুক বন্ধ এবং পরে ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনাও জাতিসংঘের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এখন সাইবার সুরক্ষা আইনের নতুন সংশোধন নিয়ে সরকারের বক্তব্য- অনলাইন অপরাধ, অপতথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি, সম্পাদনা বা পরিবর্তন করা ক্ষতিকর কনটেন্ট মোকাবিলা করা প্রয়োজন। সমালোচকদের আশঙ্কা, এর মাধ্যমে মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের পুরোনো ঝুঁকি আবার তৈরি হতে পারে।
একই প্রশ্ন জুলাই চার্টার নিয়েও – যা বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপির পাশাপাশি অনেক রাজনৈতিক দল সাইন করেছে। চার্টারে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ ও দুর্নীতি দমনসহ নানা কাঠামোগত সংস্কারের কথা ছিল। দুই বছর পর এসব সংস্কার কীভাবে এবং কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য এখনো রয়েছে।

মানবে না হার এই গণজোয়ার লেখা প্ল্যাকার্ড ধরে আছেন এক শিক্ষার্থী। ছবি: ওয়াসিউল বাহার এর, উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত। সিসি বাই-এসএ ৪.০ (CC BY-SA 4.0)।
প্রতিবাদের পরের পরীক্ষা
একটি প্রতিবাদ সরকারকে সরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, আইন ও ক্ষমতার সম্পর্ক বদলানো অনেক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। কারণ একটি সরকার বদলানো আর একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এক বিষয় নয়। সরকার পরিবর্তন দৃশ্যমান; কিন্তু গণতন্ত্রের গভীর পরিবর্তন বোঝা যায় প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং নাগরিক অধিকারের জায়গায়।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দেখিয়েছে, প্রতিবাদ রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলে দিতে পারে। দুই বছর পরের প্রশ্ন হলো, সেই প্রতিবাদ যে গণতন্ত্রের প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, তার কতটা বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
হাসনাত আবদুল্লাহর প্রশ্নটি তাই শুধু জুলাই আন্দোলনের নেতাদের নয়; এটি সেই সাধারণ মানুষদেরও প্রশ্ন, যারা রাস্তায় নেমেছিলেন, আহতদের হাসপাতালে নিয়েছিলেন, খাবার বা পানি পৌঁছে দিয়েছিলেন, কিংবা দূর থেকে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন।
সরকার বদলেছে, এটি দৃশ্যমান। কিন্তু জুলাই যে পরিবর্তনের কথা বলেছিল, তার কতটা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার কাঠামোয় স্থায়ী হয়েছে- সেই হিসাব এখনো শেষ হয়নি।





