অস্ট্রেলিয়ায় দ্রুত ছড়াচ্ছে এইচ ফাইভ এন ওয়ান (H5N1) ভাইরাস, ঝুঁকিতে উপকূলীয় পাখি ও বন্যপ্রাণী

বিজ্ঞাপন

প্রথম প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে Global Voices বাংলা ভার্সন

Little penguins vaccinations

স্ক্রিনশট – এবিসি নিউজ ভিডিও: বার্ড ফ্লু ঠেকাতে ফিলিপ আইল্যান্ডের হাজার হাজার ছোট পেঙ্গুইনকে দেওয়া হবে টিকা

অস্ট্রেলিয়ায় এইচ ফাইভ এন ওয়ান (H5N1) বার্ড ফ্লুর প্রাদুর্ভাব গুরুতর সংকট তৈরি করেছে, বিশেষ করে বন্যপ্রাণীদের জন্য। বছরের পর বছর ধরে বিশ্বের অন্যান্য দেশ এই বার্ড ফ্লুর প্রকোপে ভুগলেও, গত ২০ জুন প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া এই ভাইরাস থেকে মুক্ত ছিল।

এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অসংখ্য বন্যপাখির মৃত্যুর খবর পেয়ে কর্তৃপক্ষ একটি টিকাদান কর্মসূচি চালু করতে উদ্বুদ্ধ হয়। আর এই তালিকার একদম শীর্ষে রাখা হয়েছে ভিক্টোরিয়ার সেন্ট কিল্ডা এবং ফিলিপ আইল্যান্ডের ছোট পেঙ্গুইনের কলোনিগুলোকে।

ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা ও প্রাণী বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জুলি ওল্ড The Conversation (দ্য কনভারসেশন)-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে টিকাদান প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করে বলেছেন:

বিজ্ঞাপন

টিকা দেওয়ার জন্য বন্যপ্রাণী ধরা বেশ কঠিন একটি কাজ, কারণ বার্ড ফ্লু টিকার দুটি ডোজ সম্পূর্ণ করতে তাদের দুবার ধরতে হয়। তবে ছোট পেঙ্গুইনরা উড়তে পারে না, দলবদ্ধভাবে বাস করে এবং রাতে নিজের বাসাতেই ফিরে আসে। ফলে এদের ধরা এবং টিকা দেওয়াটা তুলনামূলক সহজ।

ভিক্টোরিয়ার অধিকাংশ বাসিন্দাই এই ঘোষণায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে এর কিছুদিনের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টিকা-বিরোধী প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে শুরু করে।

সেন্ট কিল্ডার পেঙ্গুইন কলোনিটি হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস-এর ম্যাকনামারা (McNamara) আসনের আওতাভুক্ত; সেই আসনের সংসদ সদস্য জশ বার্নস ইনস্টাগ্রামে একটি পোস্ট করেছেন:

আমাদের ছোট পেঙ্গুইন কলোনি নিয়ে এখানে একটি সুসংবাদ রয়েছে।
আমি জানি যে আমাদের সমাজের অনেকেই এইচ ফাইভ (H5) বার্ড ফ্লুর প্রাদুর্ভাব এবং তরঙ্গরোধক বাঁধে থাকা আমাদের ছোট পেঙ্গুইনগুলোর ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন।
আমরা @ninataylormp (নিনা টাইলর) এবং ভিক্টোরিয়া রাজ্য সরকারের সাথে যৌথভাবে সেন্ট কিল্ডা এবং ফিলিপ আইল্যান্ড জুড়ে ৫,০০০ -এর বেশি ছোট পেঙ্গুইনকে টিকা দিচ্ছি। এটিকে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের বন্যপাখিদের জন্য সবচেয়ে বড় টিকাদান কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যার প্রথম ডোজের কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
এখন পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় ছোট পেঙ্গুইনদের মধ্যে এইচ ৫ (H5) ভাইরাসের কোনো সংক্রমণ পাওয়া যায়নি। আর এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য হলো পেঙ্গুইনদের সংক্রমণমুক্ত রাখা।
এই পেঙ্গুইনগুলো আমাদের সমাজকে অনন্য করে তোলার অন্যতম একটি অংশ। আমরা সত্যিই ভাগ্যবান যে এদের সাথে একই এলাকায় বসবাস করতে পারছি, আর তাই এদের রক্ষা করতে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
📸 ডগ গিমেসি/এনপিএল

ফেসবুকের ক্রসপোস্টটিতে প্রায় ৩,০০০ লাইক এবং ২,০০০ মন্তব্য পড়ে। প্রত্যাশিতভাবেই, এগুলোর মধ্যে অনেক মন্তব্যই ছিল টিকা-বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিবিদকে উদ্দেশ্য করে করা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ। এই মন্তব্যগুলো ছিল তাদের সাধারণ প্রতিক্রিয়ারই প্রতিফলন:

একজন ব্যবহারকারী শেয়ার করেছেন:

তাহলে তো ওই পুচকে পেঙ্গুইনগুলোর দফারফা হয়ে গেল!

অন্য একজন মন্তব্য করেছেন:

যখনই সাধারণ মানুষ সচেতন হয়ে ওঠে, তখনই তারা টাকার প্রবাহ সচল রাখতে বন্যপ্রাণীদের দিকে হাত বাড়ায়।

এমন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখে মার্ক অ্যান্ড্রু মোটেও অবাক হননি:

হায় খোদা, এবার এই পাগলাটে টিকা-বিরোধীরা দলে দলে তেড়ে আসবে!

কুকারপিডিয়া ছিল কোভিড-১৯ মহামারির সময় সক্রিয় একটি অস্ট্রেলীয় ওয়েবসাইট। এতে লিপিবদ্ধ করা হতো “অস্ট্রেলিয়ার কুকারদের কর্মকাণ্ড।” কুকার হলো অস্ট্রেলীয় অপভাষা, যা মূলধারার হোক বা প্রান্তিক, নানা ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসী মানুষদের বোঝায়। শব্দটি কীভাবে অস্ট্রেলীয় শব্দ হয়ে উঠল, তা গ্লোবাল ভয়েসেসকে ইমেইল সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ডিকশনারি সেন্টারের মার্ক গুইন:

আমরা অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ডিকশনারির জন্য এর একটি ভুক্তির খসড়া তৈরি করেছি। তাই এ পর্যায়ে আমরা মনে করি, এই অর্থটি এখানেই উদ্ভূত হয়েছে এবং শুধু এখানেই ব্যবহৃত হয়। আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পুরোনো যে প্রমাণ আছে, তা ২০২১ সালের কোভিড মহামারির প্রেক্ষাপটে, যখন টিকা বাধ্যতামূলক করা ও লকডাউনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের অবজ্ঞাসূচকভাবে এই শব্দে ডাকা হতো। পরে এর পরিধি বেড়ে নানা ইস্যুতে প্রতিবাদকারীদেরও এর আওতায় নেওয়া হয়েছে এবং আপনি যেমন বললেন, এটি ‘ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিক’ শব্দের সমার্থকও হয়ে উঠতে পারে।

এটি তুলনামূলকভাবে নতুন একটি শব্দ, তাই আমরা এখনো এটি পর্যবেক্ষণ করছি। তবে সংসদীয় বিতর্কসহ জনপ্রিয় আলোচনায় এটি জায়গা করে নিয়েছে।

ব্যঙ্গাত্মক ওয়েবসাইট দ্য বেটুটা অ্যাডভোকেট পাখিদের টিকাদান নিয়ে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে প্রথমটি স্পষ্টতই কট্টর টিকা-বিরোধীদের উদ্দেশ্য করে লেখা হয়েছিল:

ডিওয়াইওআর: নিজে একটু গবেষণা করার পর স্থানীয় এক ককাটিল এ সপ্তাহে সমাজকে জানিয়ে দিয়েছে, ফেডারেল সরকারের দেওয়া বর্তমান বার্ড ফ্লু-র টিকা সে নেবে না।

বিশ্ব এখন নজিরবিহীন এক এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে এবং আলবানিজ সরকার দেশজুড়ে পাখিদের জানিয়েছে, তারা আগেভাগেই পদক্ষেপ নিয়ে যতগুলো সম্ভব পাখিকে রক্ষা করতে চায়।

এর মানে হচ্ছে বন্দি পাখি, চরম বিপন্ন দেশীয় প্রজাতি এবং সবার পছন্দের দারুণ সব পাখি অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে আছে। যেমন কুকাবুরা, ওয়েজ-টেইলড ঈগল, রাজহাঁস আর ব্যক্তিত্বে ভরপুর মনকাড়া হাঁসেরা।

স্থানীয় এক স্কুলছাত্রের পোষা পাখি হওয়ায় স্থানীয় ককাটিল “গান্ট”-কে ‘বন্দি পাখি’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে।

গান্ট আবার ‘সবার পছন্দের পাখি’ তালিকাতেও পড়ে, আর ‘দেশীয় প্রজাতি’-র ঘরেও টিক পড়ে তার নামে।

এসব কিছুই গান্টের কাছে অর্থহীন। শিক্ষানবিস প্রতিবেদক ওয়েন্ডেল হাসির পাখির সঙ্গে টেলিপ্যাথিক যোগাযোগের ক্ষমতার (যার সুবাদে সে এনডিআইএস এর আওতায়ও আছে) মাধ্যমে সে দ্য অ্যাডভোকেটকে জানিয়েছে, সে কবুতর নয়।

গান্ট ওয়েন্ডেলকে বলে, “ওই জঘন্য জিনিস আমি আমার শরীরে ঢোকাচ্ছি না।”

“একটু পড়াশোনা করে দেখো। পুরো তাড়াহুড়োর কাজ। এটির কোনো পরীক্ষাই করা হয়নি, আর এটা একগাদা কবুতরকে মেরেও ফেলেছে। ফাইজারের হলেও আমার কিছু যায় আসে না, আমি নেব না। ওটা তোমার পাছায় ঢুকিয়ে নাও।”

ফেডারেল সরকার সব পাখিকে আশ্বস্ত করেছে, টিকাটি নিরাপদ এবং দুশ্চিন্তার কিছু নেই। অবশ্য যতক্ষণ না দুশ্চিন্তার কিছু ঘটে।

আরও খবর আসছে।

ব্যঙ্গচিত্রশিল্পী প্যাট হাডসন ইনস্টাগ্রামে এই প্রসঙ্গে তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন:

ঘটনা যখন এগোচ্ছিল, তখন এক হাজারেরও বেশি বড় টিকিপানচিল (গ্রেটার ক্রেস্টেড টার্ন) পাখির তিনটি গণমৃত্যুর ঘটনা শনাক্ত হওয়ার পর দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার প্রিমিয়ার পিটার ম্যালিনাউস্কাস রাজ্যে এইচ ফাইভ (H5) বার্ড ফ্লু-র “উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির” ঘোষণা দেন:

ম্যালিনাউস্কাস বলেন, ধারণা করা হচ্ছে এইচ ফাইভ বার্ড ফ্লু-ই এসব মৃত্যুর কারণ।

ক্যাঙ্গারু আইল্যান্ডে পাওয়া একটি লিটল পেঙ্গুইনের সম্ভাব্য সংক্রমণও তদন্ত করছে রাজ্য কর্তৃপক্ষ। রাজ্য সংসদকে প্রিমিয়ার জানান, এই ঘটনা ‘বিশেষ উদ্বেগের।’

এর বাইরে তাসমানিয়া সরকার জানিয়েছে, কিং আইল্যান্ডে ২৮টি লিটল পেঙ্গুইনের মৃত্যুর ঘটনা তারা তদন্ত করছে। পাখিগুলো এইচ ফাইভ বার্ড ফ্লু-তে মারা গেছে কি না, তা নির্ণয়ে পরীক্ষা চলছে।

ভিন্ন এক ঘটনায়, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় সিল মাছের শরীরে বার্ড ফ্লু শনাক্ত করেছেন কর্মকর্তারা। অস্ট্রেলিয়ায় স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে এইচ ফাইভ এন ওয়ান (H5N1) ভাইরাস সংক্রমণের এটিই প্রথম নিশ্চিত নিশ্চিত ঘটনা।

এখন পর্যন্ত ১,০০০ পেঙ্গুইনকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে সৌভাগ্যবশত হাঁস-মুরগির মতো গৃহপালিত প্রাণীদের মধ্যে এখনও কোনো সংক্রমণ নিশ্চিতভাবে ধরা পড়েনি।

(English) ভাষায় লিখেছেন Kevin Rennie
(বাংলা) ভাষায় অনুবাদ করেছেন মাসুদুল জারিফ
মূল লেখাটি দেখুন (English)