তালেবানের বিধিনিষেধ থেকে আফগান নারীদের জীবনের কোনো ক্ষেত্রই এখন আর নিরাপদ, স্বাধীন বা একেবারেই মুক্ত নেই।
প্রথম প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে Global Voices বাংলা ভার্সন

আফগানিস্তানের নারীরা। বিবিসি নিউজের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ‘Women’s rights being rolled back in Afghanistan – BBC News’ ভিডিও থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট।
এই লেখাটি আরেজো ২০২৫ সালে লিখেছিলেন। তার সম্মতিতে এটি একটি বিশেষ ধারাবাহিক প্রতিবেদনের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে। এই ধারাবাহিকে ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর দেশটির তরুণী ও কিশোরীদের জীবন ও অভিজ্ঞতার গল্প তুলে ধরা হচ্ছে।
২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তান দখলের পর থেকে তালেবান ধারাবাহিকভাবে মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে এবং তাদের অধিকার সুরক্ষার জন্য গড়ে ওঠা কাঠামোগুলো ভেঙে দিচ্ছে। নারী ও কিশোরীদের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। তালেবান এমন সব কঠোর আইন ও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যার ফলে তাদের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে।
এই আইনগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল নারী ও কিশোরীদের জন্য স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি খাতে নারীদের কাজ করার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জনপরিসর থেকে নারীদের এভাবে সরিয়ে দেওয়া আফগান নারীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সবচেয়ে বড় অন্যায় ও নিপীড়নের একটি।
২০২১ সালে তালেবান প্রথমদিকে “নারীর অধিকার রক্ষা” করার আশ্বাস দিলেও পরে তারা একের পর এক এমন আইন জারি করেছে, যা নারীদের মানবিক ও সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। কার্যত তারা আফগানিস্তানকে নারীদের জন্য একটি কারাগারে পরিণত করেছে।
বাধ্যতামূলক হিজাব থেকে শুরু করে মাহরাম বা পুরুষ অভিভাবক ছাড়া নারীদের বাড়ির বাইরে বের হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা, এসব আইনই পরিকল্পিতভাবে নারীদের চলাফেরা সীমিত করা এবং তাদের ঘরের মধ্যে আটকে রাখার জন্য আরোপ করা হয়েছে। বর্তমানে জনসমাগম বা সামাজিক পরিসরে নারী ও কিশোরীদের উপস্থিতি খুব কমই দেখা যায়।
সামগ্রিকভাবে, তালেবানের এসব আইন আফগান নারীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে এবং তাদের অগ্রগতি ও বিকাশের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত করে দিচ্ছে।
একজন ব্যবসায়ী নারী হিসেবে জীবন
এমন কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই আমি, একজন আফগান নারী হিসেবে, নিজের ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নিই। এমন একটি বদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস ও কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকেই আমি আফগানিস্তানে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে নিজের পথ তৈরি করতে চেয়েছিলাম।
২০২৩ সালে ডিটারজেন্ট ও প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবসা শুরু করি। আমার এই উদ্যোগে ছয়জন নারী ও আটজন পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল।
তবে শুরু থেকেই পথটা সহজ ছিল না।
ব্যবসার নিবন্ধন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কাজ করতে সরকারি বা বেসরকারি দপ্তরে গেলে আমাকে অস্বস্তিকর দৃষ্টিতে দেখা হতো। কাজের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, এমন অনেক ব্যক্তিগত ও অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নও করা হতো। বাজার বুঝতে ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলতে দোকানে গেলে সেখানেও অনেকের আচরণে অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্য টের পেতাম।
তারপরও আমি থামিনি। সব বাধা উপেক্ষা করে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়ে নিজের কাজ চালিয়ে গেছি।
প্রতিদিন ভয় আর দুশ্চিন্তা নিয়েই অফিসে যেতাম। কখন তালেবান সদস্যরা অফিসে ঢুকে পড়বে, কখন হিজাব বা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে আমাকে একের পর এক প্রশ্নের মুখে ফেলবে, সেই আতঙ্ক সব সময় কাজ করত।
অফিস চালানোর সময় তারা আমাকে নারী কর্মীদের চাকরি থেকে বাদ দিতে বলত, আর পুরুষদের দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে বলত। আমি নারী ও পুরুষ কর্মীদের জন্য আলাদা জায়গার ব্যবস্থাও করেছিলাম। তারপরও তারা সন্তুষ্ট হয়নি। নারীদের কর্মক্ষেত্রে আসা বন্ধ বা সীমিত করার জন্য তারা কোনো না কোনো অজুহাত বের করত।
একপর্যায়ে আমাকে গ্রেপ্তার করে গুরুতর অপরাধ বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘ সময় সেখানে আটক রাখা হয়েছিল। একজন মানুষ, একজন নারী কিংবা একজন ব্যবসায়ী, কোনো পরিচয়েই আমি সেখানে ন্যূনতম সম্মান পাইনি।
অথচ আমার অপরাধ বলতে ছিল শুধু নিজের জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করা এবং অন্যদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করা।
শেষ পর্যন্ত পরিবারের জিম্মায় মুক্তি পেলেও সেই অপমানের অনুভূতি আমার ভেতরে থেকে গেছে। আমাকে যেভাবে অসম্মান ও হেয় করা হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা আমি কখনো ভুলতে পারব না।
অন্তহীন বিধিনিষেধ আর হারিয়ে যাওয়া আশা
তালেবান শাসনের অধীনে একজন আফগান নারীর জীবন মানেই একের পর এক বিধিনিষেধ, বিশেষ করে তাদের জন্য, যারা স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায় এবং সমাজে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চায়। এই বাস্তবতায় সামনে কোনো উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখা যায় না।
শিক্ষা, কাজ, স্বাধীনভাবে চলাফেরা, এমনকি নিজের পোশাক বেছে নেওয়ার অধিকারও কঠোরভাবে সীমিত করা হয়েছে।
দিন যত যাচ্ছে, আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ ততই অন্ধকার হয়ে উঠছে, বিশেষ করে নারীদের জন্য।
তালেবান শাসনের অধীনে জীবন যেন কেবল কষ্ট, দুর্ভোগ আর বাধার আরেক নাম।
আফগান নারীদের জন্য এই জীবন অনেকটা সামাজিকভাবে বন্দি হয়ে থাকার মতো। এখানে শুধু ব্যক্তিগত স্বাধীনতাই কেড়ে নেওয়া হয়নি, ভালো একটি আগামীর স্বপ্ন দেখার আশাটুকুও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।





