দেশটিতে অনলাইন মতপ্রকাশের ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রথম প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে Global Voices বাংলা ভার্সন

Photo by cottonbro studio. Used under a Pexels License.

ছবি তুলেছেন কটনব্রো স্টুডিও। পেক্সেলসের ব্যবহারের শর্ত মেনে ছবিটি নেওয়া হয়েছে। লাইসেন্সের শর্তাবলি।

এই লেখাটি গ্লোবাল ভয়েসেসের ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসের বিশেষ ধারাবাহিক, “বড় প্রযুক্তি সংস্থা ও কর্তৃত্ববাদ”-এর অংশ। এই ধারাবাহিকে আমরা অনুসন্ধান করছি, কীভাবে বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলি কর্তৃত্ববাদী সরকার ও শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে, আবার কখনও তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, এবং এই সিদ্ধান্তগুলি বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলিকে কীভাবে প্রভাবিত করে। এই বিষয়ক প্রতিবেদনগুলিকে সমর্থন করতে আপনি এখানে অনুদান দিতে পারেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সাইবার আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে খসড়া সংশোধনীকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে, অনলাইনে বাকস্বাধীনতার ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকা উচিত, তা নিয়েই মূলত এই বিতর্ক। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ জনমত জানানোর জন্য সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইনের খসড়া প্রকাশ করে। বর্তমানে খসড়াটি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম-এর নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের মন্ত্রিসভা কমিটির বিবেচনাধীন। ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক আলোচনার প্রতিবেদনে গণমাধ্যমকর্মী, আইন বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সবচেয়ে বিতর্কিত ধারাগুলি বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

নির্বাচনী প্রচারের সময় কৃত্রিমভাবে তৈরি নানা ধরনের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কৃত্রিম বাস্তবতার প্রভাব নিয়ে গ্লোবাল ভয়েসেসের আগের এক প্রতিবেদনে এমন একটি গবেষণার কথা বলা হয়েছিল, যেখানে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বা বিকৃত ৭২টি বিষয়বস্তু চিহ্নিত করা হয়। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের কৃত্রিম ছবি ছিল সবচেয়ে প্রচলিত কৌশল, পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের গ্রাফিক্সও বিকৃত করা হয়েছিল। নির্বাচনে জয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ছিল সবচেয়ে বেশি আক্রমণের লক্ষ্য, তাদের ঘিরে এমন ৪৭টি ঘটনা শনাক্ত হয়।

বিজ্ঞাপন

অনলাইনে নজরদারি এবং মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে বাংলাদেশে। ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মানহানিকর, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কিংবা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে পারে, এমন অনলাইন বিষয়বস্তুকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। ২০১৩ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে আইনটি আরও কঠোর করা হয় এবং সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়। সাংবাদিক থেকে শুরু করে সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী, অনেকের বিরুদ্ধেই এই ধারায় মামলা হয়েছিল। দীর্ঘদিনের প্রতিবাদের পর সরকার ৫৭ ধারা বাতিলের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ২০১৮ সালের অক্টোবরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্যকর হওয়ার পর একই অপরাধগুলি আইনের ২৫, ২৮, ২৯ ও ৩১ ধারায় আবারও ফিরে আসে। ২০২৩ সালে আইনমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছিলেন, এই আইনে ৭,০০১টি মামলা হয়েছে। লেখক মুশতাক আহমেদ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে দশ মাস কারাবন্দি থাকার পর ২০২১ সালে হেফাজতে মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে দেশে ও বিদেশে প্রতিবাদ শুরু হয়।

আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৩ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পরিবর্তে সাইবার নিরাপত্তা আইন চালু করে। তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, নতুন আইনেও আগের আইনের প্রায় সব দমনমূলক বৈশিষ্ট্যই অন্যভাবে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে নতুন সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনের নয়টি ধারা বাতিল করে। মানবাধিকার সংগঠনগুলির বক্তব্য, আগের বছরগুলিতে দায়ের হওয়া শত শত মামলা এখনও বিচারাধীন রয়েছে।

নির্বাচনে এবং তার বাইরেও ভুয়ো ছবি ও ভিডিও

রাজনীতিতে যুক্ত নারীরা বিশেষ ধরনের আক্রমণের শিকার হয়েছেন। নির্বাচনের আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বিষয়বস্তু নিয়ে ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগপন্থী পেজগুলি জাতীয় নাগরিক পার্টির নারী নেত্রীদের লক্ষ্য করে এমন ভুয়ো ছবি ছড়িয়েছিল, যেগুলির মাধ্যমে তাঁদের নৈতিক চরিত্র ও যৌন আচরণ নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ অপপ্রচার চালানো হয়। নির্বাচনের পর সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের লক্ষ্য করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবি ও মিথ্যা বক্তব্য ছড়ানোর ঘটনা ‘প্রথম আলো’-র একটি তথ্য যাচাই প্রতিবেদনে উঠে আসে। ‘রিউমার স্ক্যানার‘-এর তানভীর মাহতাব আবির সংবাদমাধ্যমটিকে জানান, জনপরিসরে দৃশ্যমান নারীরা, বিশেষত রাজনীতিতে যুক্ত নারীরা, প্রায়ই অপতথ্য ছড়ানোর লক্ষ্য হন।

তবে সব ভুয়ো বিষয়বস্তুর পিছনেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে না। ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর তথ্য অনুযায়ী, ফেসবুকের কিছু পেজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের, এমনকি তাঁর মেয়ে জাইমা রহমান-এর ডিপফেক ভিডিও ব্যবহার করে ভুয়ো “ফ্যামিলি কার্ড” দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়েছে। বিনিময়ে ব্যবহারকারীদের পেজগুলিতে পছন্দের চিহ্ন দিতে ও অনুসরণ করতে বলা হয়। বিশ্লেষণ করা ৫২টি পোস্টের মধ্যে ১৩টিতে জাইমার ছবি ছিল। ‘ডিসমিসল্যাব’-কে একটি পেজের প্রশাসক জানিয়েছেন, দ্রুত অনুসারী বাড়িয়ে পরে পেজগুলি বিক্রি করাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য। এ ধরনের ঘটনায় কৃত্রিম বিষয়বস্তু তৈরির পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে অর্থ উপার্জনের হিসাবও অনেক সময় প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।

একটি ঘটনা, যার কোনও প্রতিকার মেলেনি

সাধারণ নারীদের ক্ষেত্রে এই ক্ষতির প্রভাব অনেক দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ভূমিকার জন্য পরিচিত ছাত্র আন্দোলনের কর্মী ফারজানা সিথি একটি ভুয়ো ফেসবুক পরিচিতির মাধ্যমে আক্রমণের শিকার হন। ২০২৫ সালের মার্চে ‘ডিসমিসল্যাব’ ঘটনাটি নিয়ে অনুসন্ধান করে। ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত ওই পরিচিতি থেকে প্রকাশিত ১৬৬টি ভিডিও ও রিলের মধ্যে ১৩৩টিই ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ডিপফেক। সেখানে সিথির মুখ বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল দুই ভারতীয় বিষয়বস্তু নির্মাতার ভিডিওতে। সবচেয়ে বেশি দেখা পাঁচটি ভিডিওর মোট দর্শকসংখ্যা ছিল ৪১ লক্ষেরও বেশি। ফেসবুকের ‘স্টারস’ সুবিধার মাধ্যমে ওই অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থও উপার্জন করা হচ্ছিল।

সিথি ‘ডিসমিসল্যাব’-কে বলেন, “এই ভিডিওগুলি আমার চরিত্রে কলঙ্ক লাগানোর চেষ্টা।” তিনি জানান, এর ফলে তাঁকে হেনস্তা ও অপমানের শিকার হতে হয়েছে। তিনি একাধিকবার ফেসবুকের কাছে পরিচিতিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানান। ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করা তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা ভুয়ো অ্যাকাউন্ট ও ভিডিও সরিয়ে দেওয়ার জন্য ১০০ থেকে ১৫০ মার্কিন ডলার চেয়েছিলেন, যা দেওয়ার সামর্থ্য তাঁর ছিল না। ‘ডিসমিসল্যাব’-এর প্রতিবেদন প্রকাশের সময়ও পরিচিতিটি সক্রিয় ছিল। ভিডিওগুলির নীচে ধর্ষণের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।

আইনে কী রয়েছে, আর খসড়ায় কী বদলানোর প্রস্তাব

আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি, ভিডিও ও অন্যান্য বিষয়বস্তুর দ্রুত পরিবর্তনশীল জগৎটির সঙ্গে তাল মেলাতে বিদ্যমান আইনি কাঠামো হিমশিম খাচ্ছে। সাইবার সুরক্ষা আইনটি ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল কার্যকর হয় এবং ৩০ জুন সংশোধিত হয়। এর ২৫ ধারায় ইতিমধ্যেই ব্ল্যাকমেল, যৌন হয়রানি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি, শিশুদের যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত উপাদান, যৌন উদ্দেশ্যে ব্ল্যাকমেল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বা বিকৃত বিষয়বস্তু ছড়ানোর মতো অপরাধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। তবে ভুক্তভোগী নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সি হলে কারাদণ্ডের মেয়াদ পাঁচ বছর পর্যন্ত হতে পারে। মূলত বিদ্যমান অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের দিকেই এই আইন নজর দেয়। কৃত্রিমভাবে তৈরি বিষয়বস্তু বা রাজনৈতিক ডিপফেক মোকাবিলার জন্য এতে আলাদা কোনও কাঠামো নেই।

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সেই পরিবর্তনই আনার কথা বলা হয়েছে। এতে ২৫ ধারার আওতায় মানহানি, অপমান ও হেনস্তার বিষয়গুলিও যুক্ত করা হচ্ছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বিষয়বস্তুর কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘প্রথম আলো’-র আগের এক অনুসন্ধানে জানা গিয়েছিল, খসড়ায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ লক্ষ টাকা জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে। ভুক্তভোগী নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সি হলে তা বেড়ে দশ বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ লক্ষ টাকা জরিমানা হতে পারে। নতুন ২৬এ ধারায় “গুজব” বা “অপতথ্য” প্রকাশ কিংবা ছড়ানোর জন্য সর্বোচ্চ দশ বছরের কারাদণ্ড, ৪০ লক্ষ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। খসড়ায় গুজব বলতে এমন অযাচাইকৃত তথ্যকে বোঝানো হয়েছে, যা বিভ্রান্তি, আতঙ্ক বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে কিংবা তা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করে।

সরকারের বক্তব্য, ইতিমধ্যেই যে ক্ষতি হচ্ছে, তা ঠেকাতেই এই পরিবর্তনের প্রস্তাব। জুন মাসে আগের একটি সংশোধনী সংসদে তোলার সময় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিমন্ত্রী বলেছিলেন, এর ফলে মেটার মতো সংস্থাগুলিকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিতর্কিত বিষয়বস্তু সরিয়ে ফেলতে হবে। ‘প্রথম আলো’-কে সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়ো ভিডিও, অডিও ও ছবি ছড়ানো ঠেকাতেই কঠোরতর শাস্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাক্‌স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ

সমালোচকদের মতে, প্রস্তাবিত সংশোধনী এই উদ্দেশ্যের চেয়ে অনেক বেশি দূর এগিয়ে গিয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সতর্কবার্তা, “গুজব” ও “অবমাননাকর”-এর মতো শব্দের সংজ্ঞা এতটাই অস্পষ্ট যে, সেগুলি বেছে বেছে প্রয়োগ করার সুযোগ থেকে যায়। মানবাধিকার সংগঠনগুলির একটি যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই খসড়া বাতিল হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেরই প্রতিফলন। সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কাজ করা সংগঠন ‘কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস’ আপত্তি জানিয়েছে, কারণ সরকারি কর্মকর্তারা কোনও সংবাদকে অযাচাইকৃত মনে করলে তার জন্য সাংবাদিকদের ফৌজদারি দায়ের মুখে পড়তে হতে পারে। ‘এশিয়া টাইমস’-এর একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মানহানিকে ২৫ ধারার আওতায় রাখায় নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত কঠোরতর শাস্তি মানহানির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে, শুধু যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে নয়।

পরিসংখ্যান, ঘাটতি ও স্থানীয় উদ্যোগ

আইনটি যে সমস্যাগুলি মোকাবিলার দাবি করছে, সেগুলির ব্যাপ্তি যথেষ্ট বড়। ‘ঢাকা ট্রিবিউন’-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশের নারী সহায়তা সাইবার ইউনিটের কাছে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬০,৮০৮ জন নারী সাহায্য চেয়েছিলেন। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও রাষ্ট্রসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ২০২৪ সালের একটি সমীক্ষার উল্লেখও রয়েছে। তাতে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী নারীদের প্রায় ৮৯ শতাংশ অন্তত একবার অনলাইন হিংসার শিকার হয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, বহু ঘটনা নথিভুক্ত না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তবে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ডিপফেক-সংক্রান্ত ঘটনাগুলি আলাদা করে দেখানো হয়নি।

গবেষকেরা গোটা অঞ্চলে একই ধরনের প্রবণতার কথা জানিয়েছেন। ‘জার্নাল অব অনলাইন ট্রাস্ট অ্যান্ড সেফটি’-তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় শ্রীলঙ্কা, ভারত ও বাংলাদেশের ৪৯ জন সাংবাদিক, আইনজীবী, তথ্য যাচাইকারী এবং অধিকারকর্মীর অংশগ্রহণে তিনটি কর্মশালার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি আক্রমণের শিকার হন, দক্ষিণ এশীয় ভাষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রায়ই ব্যর্থ হয় এবং ভুক্তভোগীরা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পেতেও সমস্যায় পড়েন। ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য নেওয়ার খরচ বহন করতে না পারা সিথির অভিজ্ঞতাও এই শেষ সমস্যাটিরই উদাহরণ।

ডিজিটাল দক্ষতার অভাবও উদ্বেগের বিষয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে কার্যকর ডিজিটাল সাক্ষরতার হার ৪৯ শতাংশ। শহরের তুলনায় গ্রামীণ ব্যবহারকারীদের মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারের সম্ভাবনা ২৯ শতাংশ কম। এপ্রিল মাসে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যেও দেখা গেছে, পুরুষদের ৫৬.৬ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, যেখানে নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৫০.২ শতাংশ। অধিকারকর্মীদের মতে, ডিজিটাল দক্ষতা যাঁদের কম, তাঁদের পক্ষে বিকৃত বা ভুয়ো বিষয়বস্তু শনাক্ত করা কিংবা তার বিরুদ্ধে প্রতিকার চাওয়া আরও কঠিন হতে পারে। তবে এই সমীক্ষাগুলিতে ডিপফেকের সংস্পর্শে আসার বিষয়টি সরাসরি পরিমাপ করা হয়নি।

সরকারের বাইরেও তথ্য যাচাইকারীরা এই পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা করছেন। আয়োজকদের একজনের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ‘ফ্যাক্টফেস্ট ২০২৬’-এ প্রায় ১০০ জন তথ্য যাচাইকারী, সাংবাদিক ও গবেষক অংশ নেন। অনুষ্ঠানটির ১৩টি অধিবেশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নারী-পুরুষভিত্তিক অপতথ্য ছড়ানোর মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সমাপনী গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা জানান, বাংলাদেশে তথ্য যাচাইকারী সংগঠনগুলি ক্রমশ কমে আসা আর্থিক সহায়তা এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলির সঙ্গে দুর্বল সমন্বয়ের সমস্যায় পড়ছে।

মন্ত্রিসভা কমিটি এখনও খসড়াটি চূড়ান্ত করেনি। এরপর এটি সংসদে পেশ করা হবে। নাগরিক সমাজের সংগঠন ‘কনস্টিটিউশন ওয়াচডগ’ সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে, বর্তমান রূপে খসড়াটি প্রত্যাহার করে অন্তত ৩০ দিনের জন্য নতুন করে জনমত সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করা হোক। একই সঙ্গে অনলাইন হয়রানি থেকে নারী ও শিশুদের সুরক্ষা এবং ডিপফেক মোকাবিলায় সরকারের ঘোষিত উদ্দেশ্যকেও সংগঠনটি স্বীকার করেছে। আইনপ্রণেতাদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার বিতর্কিত বিধানগুলি বাদ দিয়েও কি আরও নির্দিষ্ট ও সীমিত একটি আইন দিয়ে এই সমস্যাগুলির মোকাবিলা করা সম্ভব?

(English) ভাষায় লিখেছেন Masudul Zarif
(বাংলা) ভাষায় অনুবাদ করেছেন সৌম্যদীপ দেওয়ানজী
মূল লেখাটি দেখুন (English)