তরুণ প্রজন্ম বাঁশের তৈরি পাত্র বানানোর এই কারুশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে।
প্রথম প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে Global Voices বাংলা ভার্সন
কাঠমান্ডু উপত্যকার দক্ষিণে চৌদ্দ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি ছোট গ্রাম আধুনিকতার ছোঁয়া থেকে দূরে রয়ে গেছে। বাঁশের তৈরি নেপালের ঐতিহ্যবাহী পরিমাপক পাত্র “পিয়াং”-এর নামানুসারে গড়ে ওঠা ‘পিয়াংগাঁও‘ গ্রামটির সামনে এখন দুটি পথ খোলা— হয় তাদের কারুশিল্পের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা, নয়তো নতুন বাজারের সাথে তাল মেলাতে পণ্যগুলোতে আধুনিকায়ন করা।
সব আকার ও আকৃতির বাঁশের পাত্র
পিয়াংগুলো সাধারণত মানা বা পাথি‘র সমতুল্য শস্য পরিমাপের জন্য তৈরি করা হতো, যা নেপালের গ্রামীণ এলাকায় এখনও ব্যবহৃত প্রচলিত পরিমাপের একক। যেখানে এক মানা ১০ মুঠির সমান হলেও ৮ মানায় এক পাথি হয়। শস্য, মশলা, জামাকাপড় এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র সংরক্ষণের জন্যও পিয়াং ব্যবহার করা হয়।
অতীতে পিয়াংগাঁওয়ের বেশিরভাগ বাসিন্দা পিয়াং তৈরি করতেন এবং চাল ও শস্যের বিনিময়ে এই পাত্রগুলো বিনিময় করতেন অথবা পার্শ্ববর্তী বাজারগুলোতে বিক্রি করতেন।
হালকা ওজনের হলুদ পিয়াংগুলো সময়ের সাথে সাথে ব্যবহারের ফলে সোনালী রঙ ধারণ করে। বাঁশের এই পাত্রগুলোকে পোকা-মাকড় প্রতিরোধী করার জন্য একটি বিশেষ প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়, যেখানে এগুলোকে খড়ের গাদার ওপর উত্তপ্ত করা হয়, পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় এবং চাপের সাহায্যে সংকুচিত করা হয়। নির্মাতাদের মতে এগুলো পরিবেশবান্ধবও।

৪১ বছর বয়সী তীর্থ মহারজন গত সাত বছর ধরে পিয়াং তৈরি করে আসছেন। ছবি: সঞ্জীব চৌধুরী। অনুমতিক্রমে ব্যবহৃত।
তবে কার্যকারিতা থাকা সত্ত্বেও, পিয়াং -এর চাহিদা এখন আর তেমন একটা নেই। সাত বছর আগে পিয়াং বানানো শিখে এই ঐতিহ্য ধরে রাখা কারিগর তীর্থ মহারজন গ্লোবাল ভয়েসেস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “বাজারে সহজেই প্লাস্টিকের সস্তা পাত্র এবং লোহার আরও টেকসই পাত্র পাওয়া যায়।” তিনি আরও বলেন, “আমান শাহির সহায়তায় নকশা উন্নত করার পর আমার তৈরি পণ্যগুলো জাপান ও বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশে রপ্তানি হয়েছে।”
স্থানীয় কারিগরদের সাথে কাজ করা শিল্পী আমান শাহি লিখেছেন, “পিয়াং সম্পর্কিত লোক ঐতিহ্য এবং মানুষের জ্ঞানকে আরও ব্যাপকভাবে পরিচিত করে তুলতে আমি হস্তশিল্পের প্রচারমূলক উপকরণও নকশা করেছি।” তিনি আরও লিখেছেন,”এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো পিয়াংগাঁও-এর ঐতিহ্য ও এর বাঁশশিল্পকে তুলে ধরা, সংরক্ষণ করা, শৈল্পিকভাবে নথিভুক্ত করা এবং একে বাঁচিয়ে রাখার উপায়গুলো সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া।
তিনি আরও যোগ করেন: “প্রজেক্ট পিয়াং -এর জন্য আমি নকশাকার আলিনা মানান্ধারের সাথে যৌথভাবে কাজ করছি, যিনি কারুশিল্পের ঐতিহ্যের প্রতি আমার মতোই অনুরাগী। আমরা একসাথে সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করে পিয়াং-এর জন্য একটি নতুন বাজার তৈরি করার আশা রাখি, যা নেপালের সবুজ অর্থনীতিকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে কারুশিল্পের বিশাল সম্ভাবনার ওপর আলোকপাত করার পাশাপাশি নিঃসন্দেহে অনেক পরিবেশগত ও সামাজিক সুফল বয়ে আনবে।”
অতীতের স্মৃতিচারণ
পিয়াং ছাড়াও পিয়াংগাঁও শহরটি একটি চমৎকার জায়গা যা তার অনন্য বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এই মনোরম গ্রামের জীবনযাত্রা আয়েশী এবং অতীতের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়— যেখানে পুরনো ইটের বাড়িগুলো শুকানো ভুট্টার ছড়া দিয়ে সাজানো থাকে, রাস্তায় শস্য শুকাতে দেওয়া হয়, হাঁস ও মুরগির ঝাঁক রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় এবং পুরুষ ও নারীরা রোদে বসে গল্পগুজব ও গৃহস্থালির টুকটাক কাজ করেন।
১৯৭০-এর দশকে পিয়াংগাঁও নিয়ে গবেষণা করা প্যারিসের জাতীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্র (ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ) -এর এমেরিটাস গবেষণা পরিচালক জেরার্ড টফিনের মতে, “…এলাকার একমাত্র রাস্তাটি এখনও আগের মতোই রয়েছে, যার দুই পাশে ভুট্টা শুকানোর জন্য উচুঁ কাঠের খুঁটি এবং সারিবদ্ধ ঘনবসতিপূর্ণ বাড়ি রয়েছে।”
টফিন আরও লিখেছেন: “তার চেয়েও বড় কথা, তরুণরা বাঁশের পাত্র তৈরির শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে, যাকে ‘পিয়াং’ (অথবা দিয়াংচা, হাপা) বলা হয় (যেখান থেকে গ্রামটির নেপালি নামের উৎপত্তি)। এই পাত্রগুলো একসময় শস্য মাপতে এবং বিভিন্ন ধরণের মশলা সংরক্ষণ করতে ব্যবহৃত হতো।”









