মানুষের একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকার সহজাত চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়াই এই ধারাবাহিকের উদ্দেশ্য।
প্রথম প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে Global Voices বাংলা ভার্সন

গুস্তাভো নাসিমিয়েন্তোর ছবি। অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রগ্রেসিভ কমিউনিকেশনসের সৌজন্যে, অনুমতি নিয়ে ব্যবহৃত।
এই লেখাটি ‘এআইকে জিজ্ঞাসা নয়, সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করুন’ শীর্ষক একটি যৌথ উদ্যোগের অংশ। গ্লোবাল ভয়েসেস, অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রগ্রেসিভ কমিউনিকেশনস এবং জেন্ডার আইটির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ধারাবাহিকের সূচনা। কয়েক দশক ধরে মানুষে মানুষে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের যে চর্চা চলে আসছে, তার গুরুত্ব আরও একবার সামনে আনাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য। ধারাবাহিকের অন্যান্য লেখা পড়তে পারেন এপিসি, জেন্ডার আইটি এবং গ্লোবাল ভয়েসেসের ওয়েবসাইটে। এটি গ্লোবাল ভয়েসেসের এপ্রিল ২০২৬-এর বিশেষ ধারাবাহিক ‘এআই নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি’-এরও অংশ। এই উদ্যোগকে সমর্থন করতে চাইলে এখানে অনুদান দিতে পারেন।
এই সম্পাদকীয়টি তিনজন সম্পাদকের যৌথ লেখা। প্রত্যেকের বলার ধরন, ভাবনা প্রকাশের ভঙ্গি এবং লেখার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আলাদা। আমরা সচেতনভাবেই সেই স্বাতন্ত্র্যে হাত দিইনি। কেবল বানান ও যতিচিহ্নের প্রয়োজনীয় সংশোধন করেছি। মানুষের সৃজনশীলতা ও বৈচিত্র্যকে মর্যাদা দেওয়াই এই সিদ্ধান্তের কারণ। আর সেটিই এই ধারাবাহিকের মূল ভাবনা।
মানবাধিকার রক্ষা এবং প্রান্তিক মানুষের কথা ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরার লক্ষ্যে কাজ করা যোগাযোগমাধ্যমের সম্পাদক হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আমরা একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা সংক্ষেপে এআই নামে পরিচিত বৃহৎ ভাষা মডেলের সাহায্যে তৈরি বিষয়বস্তুর ক্রমবর্ধমান স্রোত কীভাবে সামলাব?
একদিকে, সম্পদ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এমন করপোরেট ব্যবস্থার মধ্যে এই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার নানা ঝুঁকি ও ক্ষতিকর প্রভাব ডেকে আনছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিবেশের ওপর বিপর্যয়কর প্রভাব, জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের শোষণ, নজরদারি ও যুদ্ধে এআইয়ের ব্যবহার, পাশাপাশি আরও নানা ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন। অন্যদিকে, এই প্রযুক্তি যে অনেকের কাছে বাস্তবসম্মত ও সহজলভ্য সহায়ক হয়ে উঠতে পারে, সেটাও আমরা জানি। যেমন, গ্লোবাল সাউথের যেসব লেখক ইংরেজি বা স্প্যানিশের মতো নিজের মাতৃভাষা নয়, এমন ভাষায় লেখার চেষ্টা করেন, তাঁদের জন্য এআই একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও নিজেদের কাজের সুবিধার্থে এআই ব্যবহার করেন।
এই দ্বন্দ্বপূর্ণ বাস্তবতা বুঝতে এবং এআই নিয়ে নানা আলোচনা ও বিভ্রান্তির মধ্যে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে গিয়ে আমরা লেখক ও পাঠকদের জন্য একটি মুক্ত পরিসর বজায় রাখার কথাও ভেবেছি। সেই উদ্দেশ্যে গত বছর এপিসি এবং তাদের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ জেন্ডার আইটি একটি নীতিমালা তৈরি করে। নীতিমালাটি তৈরির সময় গ্লোবাল ভয়েসেসের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছিল। এর আগে গ্লোবাল ভয়েসেসও তাদের নিজস্ব এআই নীতিমালা প্রকাশ করেছিল। উভয় ক্ষেত্রেই সংস্থাগুলি মানুষের নিজস্ব কণ্ঠস্বর, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা এবং শ্রমের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়ে ভেবেছে। মানুষের সৃজনশীলতাকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি পারস্পরিক আস্থা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলার পথ খোঁজা হয়েছে। কোনও বিষয়কে শুধু ভালো বা মন্দের তকমা না দিয়ে কিংবা প্রযুক্তির ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার চেষ্টা না করে। সেই ভাবনা থেকেই নীতিমালাগুলিতে বলা হয়েছে:
গ্লোবাল ভয়েসেস গর্বের সঙ্গে মানুষের জন্য মানুষের তৈরি লেখা, অনুবাদ ও অলংকরণ প্রকাশ করে। যাঁরা আমাদের সঙ্গে কাজ করেন, তাঁদের কাছ থেকেও আমরা এই মান বজায় রাখার প্রত্যাশা করি।
বৈচিত্র্যে ভরা এবং মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি নেটওয়ার্ক হিসেবে এপিসি এমন বিষয়বস্তুকে গুরুত্ব দেয়, যা মানুষের সৃজনশীল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়। এই সৃজনশীলতাকে সমৃদ্ধ করে নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত মানুষ ও সংস্থাগুলির জীবন থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক যোগাযোগ, দক্ষতা এবং বৈচিত্র্য।
এই অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা যখন একসঙ্গে কাজ করতে শুরু করলাম, তখন একটি নতুন ভাবনা এল: শুধু মানুষের বৈচিত্র্য ও সৃজনশীলতার গুরুত্বের কথা বললেই কি যথেষ্ট? কাজের মধ্য দিয়েও যদি তা দেখানো যায়, কেমন হয়? এই ভাবনা থেকেই একটি ধারাবাহিকের পরিকল্পনা তৈরি হল: ‘এআইকে নয়, একে অপরকে জিজ্ঞেস করুন’। এটি গ্লোবাল ভয়েসেস এবং এপিসির দুটি মঞ্চ, এপিসি.অর্গ ও জেন্ডারআইটি.অর্গ-এর যৌথ উদ্যোগ।
কয়েক দশক ধরে মানুষে মানুষে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের যে চর্চা চলে আসছে, তার গুরুত্ব নতুন করে তুলে ধরাই এই ধারাবাহিকের লক্ষ্য। বছরের পর বছর ধরে অর্জিত অভিজ্ঞতা, স্থানীয় বাস্তবতা এবং একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার আকাঙ্ক্ষা থেকেই গড়ে ওঠে মানুষের মধ্যে তথ্য ও দক্ষতা ভাগ করে নেওয়ার এই প্রক্রিয়া। কিন্তু জেনারেটিভ এআই আসার পর সেই যোগাযোগ ক্রমশ কমে যাচ্ছে। কোনও প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মানুষ এখন পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, সহকর্মী কিংবা আশপাশের পরিচিত মানুষের কাছে যাওয়ার বদলে এআই-নির্ভর প্রযুক্তির দ্বারস্থ হচ্ছে।
মানুষের একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার সহজাত চাহিদা, কোনও গোষ্ঠী বা সমাজের অংশ হয়ে থাকার অনুভূতি এবং আপনজনদের সঙ্গে সম্পর্কের টান, এই ধারাবাহিকের মূল ভাবনা সেই জায়গাতেই। আমাদের ভাবনাচিন্তার পর্বগুলিতে আমরা বুঝেছি, মানুষের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার এই চর্চাকে ফিরিয়ে আনা জরুরি। কারণ, প্রত্যেকে একই প্রশ্নকে নিজের মতো করে বোঝেন এবং নিজের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি থেকে উত্তর দেন। এই ভাবনাই আমাদের কাজের ভিত্তি। আমরা প্রত্যেকের নিজস্ব কণ্ঠস্বরের গুরুত্ব তুলে ধরতে চাই। সেই স্বাতন্ত্র্য এআইয়ের একঘেয়ে উত্তরে কখনও ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়।
এই ধারাবাহিকের জন্য শুরুতে আমরা দুটি সাধারণ প্রশ্ন তৈরি করেছি। অনেকটা এমনভাবে, যেভাবে কেউ এআইকে প্রশ্ন করতে পারেন:
- এআইয়ের যুগে মানুষের সৃজনশীলতা ও পারস্পরিক যোগাযোগকে গুরুত্ব দেওয়া কেন জরুরি?
- মানবাধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এআইকে পরিচালিত করতে কী করা যেতে পারে?
তবে এখানে এই প্রশ্নগুলির উত্তর দেবেন বিভিন্ন দেশের, ভিন্ন ভিন্ন পটভূমি থেকে উঠে আসা লেখক ও চিত্রশিল্পীরা। প্রত্যেকে নিজের মতো করে বিষয়গুলি নিয়ে ভাববেন এবং নিজস্ব পথে উত্তর খুঁজবেন। লেখাগুলি সম্পাদনা ও অনুবাদ করবেন মানুষই। তাতে থাকবে মানুষের আবেগ, ভাবনা, উপলব্ধি এবং মতের অমিল। এই কাজের জন্য লেখক ও শিল্পীদের পারিশ্রমিক দেওয়া হবে, তাঁদের অবদানের স্বীকৃতিও যথাযথভাবে জানানো হবে। ব্যবহারকারীদের মন জয় করে তাঁদের মনোযোগ ধরে রাখার উদ্দেশ্যে তৈরি অস্বচ্ছ অ্যালগরিদমের বাঁধাধরা উত্তরের বদলে আমরা নানা দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তার খোরাক জোগানো ভাবনা সামনে আনতে চাই, যা নতুন আলোচনা শুরু করতে পারে। কারণ, প্রত্যেক মানুষই নিজের মতো করে এই প্রশ্নগুলি নিয়ে ভাববেন এবং উত্তর খুঁজবেন।
এই ধারাবাহিক তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় আমরা তিন সম্পাদক সহযাত্রী হিসেবে একটি অভিন্ন লক্ষ্য ভাগ করে নিয়েছি। পাশাপাশি, প্রত্যেকে নিজেদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরেছি। সেই ভাবনাগুলিকে একসঙ্গে বুনে তৈরি হয়েছে একটি নকশিকাঁথার মতো কাজ, যেখানে আলাদা আলাদা টুকরো মিলে তৈরি হয় সম্পূর্ণ নকশা। এই সম্পাদকীয়টিও আমরা যৌথভাবে লিখেছি। আজ এই ধারাবাহিক ও তার উদ্দেশ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরে আমরা আমাদের পাঠকদের মতামত শুনতে চাই। একসঙ্গে ভাবতে চাই, ভিন্নমতকে স্বাগত জানাতে চাই, কোন কোন বিষয়ে আমাদের মিল রয়েছে তা খুঁজে দেখতে চাই এবং ভবিষ্যতের পর্বগুলির জন্য নতুন প্রশ্ন তৈরির কাজেও আপনাদের পাশে পেতে চাই।
আজ আপনাদেরও এই উদ্যোগে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। নিজের চারপাশের মানুষদের সঙ্গে কথা বলুন, তাঁরা কী ভাবছেন তা জানুন, তাঁদের লেখা ও ভাবনা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিন। নিজেদের ভাবনা ও সৃজনশীল কাজও অন্যদের সামনে তুলে ধরুন, এককভাবে কিংবা অন্যদের সঙ্গে মিলিতভাবে। প্রচলিত পথের বাইরে গিয়ে কাজ করলে আমরা বুঝতে পারব, ভবিষ্যৎ কোনও পূর্বনির্ধারিত পথে এগোতে বাধ্য নয়। কোনও প্রযুক্তি ব্যবহার করতেই হবে কিংবা তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বেই, এমন কোনও কথা নেই। বিকল্প পথে কাজ করার সুযোগ বরাবরই ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে।
এপ্রিল মাস জুড়ে এপিসি.অর্গ, জেন্ডারআইটি.অর্গ এবং গ্লোবালভয়েসেস.অর্গ-এ এই ধারাবাহিকের লেখা প্রকাশিত হবে। এই উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির আরও লেখা সম্পর্কে ইমেলে খবর পেতে চাইলে এখানে এপিসির নিউজলেটারে এবং এখানে গ্লোবাল ভয়েসেসের নিউজলেটারে নাম নথিভুক্ত করতে পারেন।
আমেয়া নাগরাজন গ্লোবাল ভয়েসেসের নিউজরুমের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক এবং অ্যাডভক্সের সম্পাদক।
দেবোরা প্রাদো এপিসি.অর্গ-এর প্রধান সম্পাদক। তিনি একজন সাংবাদিক; কৌশলগত যোগাযোগ, নারীবাদ ও মানবাধিকার নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
হিজা কামরান জেন্ডারআইটি.অর্গ-এর প্রধান সম্পাদক এবং এপিসির নারী অধিকার কর্মসূচির অধিকার-সুরক্ষা কৌশলবিদ।
অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রগ্রেসিভ কমিউনিকেশনস বা এপিসি বিভিন্ন সংস্থা ও কর্মীদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি সদস্যভিত্তিক নেটওয়ার্ক। এপিসি.অর্গ তাদের প্রধান ওয়েবসাইট। এখানে সংবাদ, হালনাগাদ তথ্য, ব্লগ, কলাম ও প্রকাশনা তুলে ধরা হয়। ইন্টারনেট ও তথ্য-যোগাযোগ প্রযুক্তিকে কীভাবে সামাজিক, লিঙ্গভিত্তিক এবং পরিবেশগত ন্যায়বিচারের পক্ষে কাজে লাগানো যায়, তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জেন্ডারআইটি.অর্গ একটি নারীবাদী প্রকাশনা, যা এপিসির নারী অধিকার কর্মসূচির অধীনে পরিচালিত হয়। লিঙ্গ, যৌনতা ও প্রযুক্তির সংযোগস্থলে থাকা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এখানে আন্তঃসংযোগমূলক নারীবাদী বিশ্লেষণ ও মতামত প্রকাশ করা হয়।
গ্লোবালভয়েসেস.অর্গ বিভিন্ন দেশের লেখক, অনুবাদক ও মানবাধিকার কর্মীদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি আন্তর্জাতিক বহুভাষিক নেটওয়ার্ক। বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের গল্প তুলে ধরে বিভিন্ন দেশ ও সমাজের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতে তারা ইন্টারনেটের শক্তিকে কাজে লাগায়।






