বিলুপ্তির আশঙ্কায় থাকা জুয়াং ভাষা ও সংস্কৃতি ভিডিওর মাধ্যমে তুলে ধরছেন উড়িষ্যার এই শিক্ষাবিদ।

বিজ্ঞাপন

প্রথম প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে Global Voices বাংলা ভার্সন

ভারতের মহীশূরে ওপিনো গোমাঙ্গোর সাক্ষাৎকারে ক্ষেত্রবাসী জুয়াং

ভারতের মহীশূরে ওপিনো গোমাঙ্গোর সাক্ষাৎকারে ক্ষেত্রবাসী জুয়াং। ছবি: লেখকের সৌজন্যে।

এই লেখাটি গ্লোবাল ভয়েসেসের ২০২৬ সালের আগস্ট মাসের বিশেষ ধারাবাহিক, ‘আদিবাসীদের অধিকার’-এর অংশ। এই ধারাবাহিকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, অভিজ্ঞতা ও লড়াইয়ের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসী সম্প্রদায়গুলির মধ্যে যোগাযোগের সেতু গড়ে তোলা, তাঁদের নিজেদের কথা ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাঁদের সমাজের নানা মানুষের জীবন ও উদ্যোগের গল্প আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই ধারাবাহিকের উদ্দেশ্য। এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এখানে অনুদান দিয়ে পাশে থাকতে পারেন।

বিশ্বের অধিকাংশ ভাষাই মূলত কথ্য, লিখিত নয়। এই ভাষাগুলির মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মুখে মুখেই বেঁচে রয়েছে। অথচ উইকিপিডিয়া এবং উইকিমিডিয়ার অন্যান্য প্রকল্পে কোনও তথ্যের সমর্থনে লিখিত সূত্রের প্রয়োজন হয়। ফলে মৌখিকভাবে প্রচলিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে সেখানে তুলে ধরা বেশ কঠিন।

এই সমস্যার সমাধানে একটি পদ্ধতি তৈরি করছে ‘ওপেনস্পিকস আর্কাইভস’। ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার প্রায় ২০টি ভাষাগোষ্ঠী-সহ বিভিন্ন আদিবাসী এবং যেসব ভাষার সংরক্ষণ ও চর্চার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সুযোগ সীমিত, সেই ভাষাগোষ্ঠীগুলির মৌখিক জ্ঞান কীভাবে তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়েই এই উদ্যোগের কাজ। এর মধ্যে রয়েছে অডিও-ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে তথ্য সংরক্ষণ, প্রযুক্তিগত ও শিক্ষামূলক উপকরণ তৈরি এবং স্থানীয় মানুষদের এই কাজে আরও দক্ষ করে তোলা।

বিজ্ঞাপন

এই সাক্ষাৎকার-ধারাবাহিকে এমন কয়েকজন সহযোগীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে, যাঁরা ছবি, শব্দ ও ভিডিওর মাধ্যমে নিজেদের সম্প্রদায়ের মৌখিক জ্ঞান ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের কাজ করছেন। প্রথম পর্বে কথা হয়েছে ক্ষেত্রবাসী জুয়াংয়ের সঙ্গে। তিনি একজন শিক্ষাবিদ, লেখক এবং জুয়াং ভাষার বক্তা। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য উড়িষ্যার প্রায় ৩০ হাজার মানুষের মুখের ভাষা জুয়াং একটি বিপন্ন আদিবাসী ভাষা।

‘রাইজিং ভয়েসেস’-এর পক্ষ থেকে ওপিনো গোমাঙ্গো সরাসরি এবং শুভাশিষ পাণিগ্রাহী ফোনে ক্ষেত্রবাসী জুয়াংয়ের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। নিচে ওপিনো গোমাঙ্গোর নেওয়া সেই ভিডিও সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হল। এটি ওপেনস্পিকস আর্কাইভসের জন্য ধারণ করা হয়েছে এবং ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের আওতায় সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত।

ক্ষেত্রবাসী জুয়াং: কিছু কাজ অবশ্যই হয়েছে। উড়িষ্যা সরকার বহুভাষিক শিক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে জুয়াং ভাষা নিয়ে কাজ করেছে। ‘আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতি অ্যাকাডেমি’ তিনটি ভাষায় বই প্রকাশ করেছে। ‘পূর্বাঞ্চলীয় আঞ্চলিক ভাষা কেন্দ্র’ একটি প্রাথমিক পাঠ্যবই ও একটি ব্যাকরণ বই প্রকাশ করেছে। ‘ভারতীয় ভাষা কেন্দ্রীয় সংস্থা’ জুয়াং ভাষা নিয়ে একটি উল্লেখযোগ্য গবেষণা কর্মসূচিও পরিচালনা করেছে। তবে আমাদের মানুষজন, সমাজ ও সংস্কৃতি, আমাদের উৎসব, বিয়ের অনুষ্ঠান, গান, এসবের কথা এখনও খুব একটা নথিবদ্ধ হয়নি।

রাইজিং ভয়েসেস: আপনার ভাষার ক্ষেত্রে অডিও-ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে তথ্য সংরক্ষণ কতটা কাজে আসতে পারে?

ক্ষেত্রবাসী জুয়াং: এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে উপকারী। আমি একে স্বাগত জানাই। জুয়াং ভাষার ব্যবহার ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। বিশ্বায়নের ফলে প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও অনেক ভাষা মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি যেন ক্রমশ থমকে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই এগুলিকে ধরে রাখা ও সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। এই কাজের গুরুত্ব ঠিক এখানেই।

একবার কল্পনা করুন, আগামী প্রজন্মের কেউ আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে পিএইচডি করছেন। গবেষণা করতে গিয়ে তিনি দেখবেন, তাঁর জন্য কত তথ্যই না আগে থেকে সংরক্ষিত রয়েছে! এই নথিগুলি আমাদের নতুন প্রজন্মের ভাষাভাষীদের কাছেও অমূল্য হয়ে উঠবে। আজকের শিশুরাই তো আগামী দিনের তরুণ প্রজন্ম। তারা যদি একদিন জুয়াং ভাষায় তৈরি এই ভিডিওগুলি দেখে, তাহলে বুঝতে পারবে, নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কেউ একসময় আন্তরিক চেষ্টা করেছিলেন। ভিডিওগুলি উইকিপিডিয়ায় এবং তার বাইরেও থেকে যাবে।

ধরা যাক, আজ, ২০২৬ সালে, একটি রেকর্ডিং করা হল। কয়েক দশক পর কেউ যখন সেটি শুনবেন, তখন তিনি বুঝতে পারবেন, কীভাবে ভাষাটি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছিল, কীভাবে সংস্কৃতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছিল এবং কীভাবে এত কিছুর মধ্যেও তা টিকে ছিল।

বিষয়টিকে আমি পিচঢালা রাস্তার সঙ্গে তুলনা করি। কোথাও কোথাও রাস্তার পিচ ফেটে গিয়েছে, উঠে এসেছে, আর সেই ফাটল ভেদ করে মাথা তুলেছে সবুজ ঘাস। প্রতিদিন অসংখ্য যানবাহন তার ওপর দিয়ে চলে গেলেও ঘাসগুলি বেঁচে থাকে। আমাদের ভাষাকেও আমি ঠিক তেমনই দেখি। পৃথিবী যতই বিশ্বায়িত হয়ে উঠুক না কেন, আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতি টিকে আছে, ভবিষ্যতেও টিকে থাকবে।

রাইজিং ভয়েসেস: অডিও-ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে তথ্য সংরক্ষণ জুয়াং ভাষাভাষীদের কীভাবে সাহায্য করবে?

ক্ষেত্রবাসী জুয়াং: যাঁরা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী, তাঁদের জন্য এই কাজ খুবই উপকারী হবে। বিশেষ করে তিন থেকে বারো বছর বয়সি শিশুদের কাছে এর গুরুত্ব অনেক। শিশুমনস্তত্ত্বের দৃষ্টিতে এই বয়সের শিশুরা একই সঙ্গে একাধিক ভাষা ও সংস্কৃতি শিখতে পারে। আমরা এখন যা তৈরি করছি, তা সরাসরি তাদের কাজে আসবে।

নথিবদ্ধ অডিও-ভিডিওতে সাবটাইটেল বা ক্যাপশন যোগ করার বিষয়টিও ভেবে দেখুন।

জুয়াং ভাষাভাষীদের মধ্যে দুটি গোষ্ঠীর কথা বলা যায়। প্রথম গোষ্ঠীর মানুষজন নগরায়ণের কারণে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে গিয়েছেন। বর্তমানে হয়তো মাত্র এক শতাংশ জুয়াং ভাষাভাষী শহরে থাকেন। শহরে বসবাসকারী কোনও জুয়াং ব্যক্তি যদি এই নথিগুলির খোঁজ পান, তাঁর কাছে সেগুলি যেন ইতিহাসেরই এক টুকরো হয়ে উঠবে। তিনি এর মধ্যে নিজের আত্মমর্যাদা খুঁজে পাবেন, নিজের পরিচয় নিয়ে গর্ব অনুভব করবেন।

অন্যদিকে, যাঁরা নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যেই থেকে গিয়েছেন, তাঁরা এমন এক জীবনধারা ধরে রেখেছেন, যার মধ্যে গভীর নৈতিক মূল্যবোধ জড়িয়ে রয়েছে।

জুয়াং ঐতিহ্যে, চার-পাঁচজন মানুষ যদি একসঙ্গে ধনুক, তির ও বর্শা হাতে কোথাও হাঁটতে যান, তবে তা একটি দুঃসংবাদের ইঙ্গিত। অর্থাৎ, কোনও গ্রামে কারও মৃত্যু হয়েছে। এমন অনেক প্রথা রয়েছে, যেগুলির তাৎপর্য কেবল লিখে বোঝানো সহজ নয়।

আমাদের মায়েদের জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের কথাই ধরুন। তাঁরা বাইরে গিয়ে শুকনো কাঠ ও ছোট ছোট ডালপালা কুড়িয়ে আনেন, সেগুলি এক জায়গায় জড়ো করেন এবং তারপর একে একে ডাল ভেঙে রাখেন। সেই ডালপালাগুলি অন্য কেউ নিয়ে যান না। কারণ, সবাই জানেন, কেউ সেগুলি নিজের জন্য সেখানে রেখে গিয়েছেন। এই যে পারস্পরিক বিশ্বাস, এই যে না-বলা এক নৈতিক নিয়ম, আমাদের সম্প্রদায়ের বাইরের সমাজও তা থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে।

সাবটাইটেল থাকলে অন্যরাও এই রীতিনীতি ও তার তাৎপর্য বুঝতে পারবেন। আমার বিশ্বাস, এই ঐতিহ্যগুলিকে নথিবদ্ধ করে রাখা গেলে তা সমগ্র মানবজাতির জন্য এক অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠবে।

ওপিনো গোমাঙ্গো: জুয়াং ভাষা ও সংস্কৃতির তথ্য সংরক্ষণের ঘাটতি পূরণে আপনি কীভাবে অবদান রাখছেন?

ক্ষেত্রবাসী জুয়াং: আমার ইউটিউব চ্যানেল ‘মাজাং স্টুডিও ভ্লগার’-এর মাধ্যমে আমি আমাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান সংরক্ষণের চেষ্টা করছি। এই চ্যানেলে পাথর ঘষে কীভাবে আগুন জ্বালাতে হয়, বর্ষাকালে কীভাবে তালপাতার নিচে আশ্রয় নিতে হয়, এমন নানা বিষয়ের ভিডিও রয়েছে।

বইয়ের পাতায় এসব বিষয় তুলে ধরা খুবই কঠিন। যতটা ভালোভাবে রেকর্ড করতে চেয়েছিলাম, হয়তো ততটা পারিনি। তবু চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। মানুষজন ধীরে ধীরে অনেক ঐতিহ্যগত পদ্ধতি থেকে সরে আসছেন। আমার হাতে যত রকম উপায় রয়েছে, তার মাধ্যমেই আদিবাসী হিসেবে নিজের পরিচয় ও ঐতিহ্যকে সবার সামনে তুলে ধরছি। তবে এই কাজ আরও অনেক বড় পরিসরে হওয়া দরকার।

(English) ভাষায় লিখেছেন Subhashish Panigrahi
(বাংলা) ভাষায় অনুবাদ করেছেন সৌম্যদীপ দেওয়ানজী
মূল লেখাটি দেখুন (English)