বনজ সম্পদ কাজে লাগিয়ে তৈরি হচ্ছে পরিবেশবান্ধব পণ্য, কমছে কার্বন নিঃসরণ, বাড়ছে স্থানীয় মানুষের জীবিকার সুযোগ।

বিজ্ঞাপন

প্রথম প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে Global Voices বাংলা ভার্সন

পাতার তৈরি থালা ও বাটি

শালগাছের পাতা দিয়ে তৈরি দুনা (বাটি) ও টাপারি (থালা)। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্সের ব্যবহারকারী জনক ভট্ট। ক্রিয়েটিভ কমন্স স্বীকৃতি-শেয়ার অনুরূপ ৪.০ লাইসেন্সের অধীনে।

নেপালের অধিকাংশ সামাজিক ভোজে ঐতিহ্যবাহী পাতার থালার জায়গা নিয়েছে কাগজ, প্লাস্টিক ও থার্মোকলের থালা। তবে দেশের গ্রামাঞ্চলে এখনও মালু লতা (একধরনের বড়, কাঠজাতীয় আরোহী লতা) ও কলাপাতা দিয়ে তৈরি থালা ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি রয়েছে শালগাছ (Shorea robusta) ও সুপারি গাছের পাতা দিয়ে তৈরি দুনা (বাটি) এবং টাপারি (থালা)।

নেপালের খাদ্যসংস্কৃতি বিষয়ক লেখক জ্যোতি পাঠক লিখেছেন, “নেপালে নানা উপলক্ষে তাজা পাতা দিয়ে তৈরি থালা ও বাটি ব্যবহার করা হয়। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, শিশুদের মুখেভাত, বিভিন্ন উৎসবের ভোজ এবং বিয়ের অনুষ্ঠানেও এগুলি ব্যবহৃত হয়।” তিনি আরও লিখেছেন, “শুকনো শালপাতার থালা মূলত পিকনিক, রেস্তরাঁ, গ্রামের অনুষ্ঠান এবং রাস্তার ধারের খাবারের দোকানে একবার ব্যবহারযোগ্য থালা হিসেবে কাজে লাগে।”

পরিবেশবান্ধব শালপাতার থালা ও বাটির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু ক্ষুদ্র উদ্যোগ। এর মধ্যে কয়েকটি উদ্যোগকে সহায়তা করছে বেসরকারি সংস্থা।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাজ্য-প্রবাসী রাঁধুনি ও গবেষণা-উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ বিনোদ বারাল ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘টাপারি গ্লোবাল প্রাইভেট লিমিটেড’-এর সঙ্গে যুক্ত। নেপালে বাণিজ্যিকভাবে টাপারি তৈরি করে এই সংস্থা। এখানে এক হাজারেরও বেশি পরিবারের মহিলারা কাজ করেন। শালপাতার গুরুত্ব এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি নিয়ে বারাল তাঁর অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন।

বারাল লিখেছেন, “শালপাতার থালা তৈরিতে খুব সামান্য প্রক্রিয়াকরণ ও শক্তির প্রয়োজন হয়। ফলে প্লাস্টিক বা কাগজের থালা তৈরির তুলনায় এর কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ অনেক কম।” তাঁর কথায়, “শালপাতার থালায় কোনও রাসায়নিক থাকে না এবং খাবারে ক্ষতিকর পদার্থ মিশে যাওয়ার আশঙ্কাও নেই। প্লাস্টিক ও ফোমের তৈরি বিকল্প থালার ক্ষেত্রে এমনটা হতে পারে। তাই বিশেষত ইউরোপ ও আমেরিকার মতো পরিবেশসচেতন অঞ্চলে খাবার পরিবেশনের জন্য শালপাতার থালা স্বাস্থ্যকর বিকল্প।”

পশ্চিম নেপালের দাঙিশরণ গ্রামীণ পুরসভার ‘মিলিজুলি তিলকন্যা দুনাটাপরি উদ্যোক্তা গোষ্ঠী’র ২১ জন মহিলা দুনা ও টাপারি তৈরি করেন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ‘ফরেস্ট অ্যান্ড ফার্ম ফ্যাসিলিটি’ এই উদ্যোগে সহায়তা করছে। তাঁরা ‘ন্যাশনাল ইনোভেশন সেন্টার’-এর তৈরি বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রে এই থালা ও বাটি বানান।

একইভাবে, পশ্চিম নেপালের পিউঠান জেলার ধুলেখার কমিউনিটি ফরেস্ট থেকে শালপাতা সংগ্রহ করে পরিবেশবান্ধব জৈব-বিয়োজ্য বাটি ও থালা তৈরি করছে একটি উদ্যোগ। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে এই উদ্যোগটি গড়ে উঠেছে অলাভজনক সংস্থা ‘পিপল, এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন’ (পিডা)-এর সহায়তায়।

পিডার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২২ জন মহিলার পরিচালনায় এই উদ্যোগে অর্ধেকেরও বেশি আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য। এখানে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান ও পদ্ধতির সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তি এবং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদনকে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে প্রথাগত দক্ষতা হয়ে উঠেছে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জীবিকার এক নতুন ভিত্তি।

৩৩৯টি পরিবারের পরিচালনায় থাকা ৪৮৮.৬৮ হেক্টর আয়তনের এই কমিউনিটি ফরেস্ট থেকে বছরে ২৫ হাজার কিলোগ্রামেরও বেশি শালপাতা সংগ্রহ করা সম্ভব। এই পরিমাণ পাতা দিয়ে বছরে প্রায় ৫২ লক্ষ জৈব-বিয়োজ্য বাটি এবং ১৫ লক্ষ থালা তৈরি করা যেতে পারে।

এটি এমন বহু কমিউনিটি ফরেস্টের মধ্যে একটি মাত্র। একইভাবে, এই মহিলা গোষ্ঠীও জৈব-বিয়োজ্য বাটি ও থালা তৈরির কাজে যুক্ত অসংখ্য গোষ্ঠীর মধ্যে একটি। এই উদ্যোগের সম্ভাবনা বিপুল।

নেপালের কমিউনিটি ফরেস্ট বা জনগোষ্ঠী পরিচালিত বনগুলি আসলে জাতীয় বনভূমির সেই অংশ, যা সংরক্ষণ, পরিচালনা ও ব্যবহারের জন্য স্থানীয় বন-ব্যবহারকারী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ১৯৯৩ সালের বন আইন অনুযায়ী, এই বনগুলি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং কমিউনিটি ফরেস্ট ব্যবহারকারী গোষ্ঠীগুলিকে স্বশাসিত ও স্বতন্ত্র কর্পোরেট সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ফলে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বেড়েছে। নির্দিষ্ট বন পরিচালনা পরিকল্পনা অনুসরণ করে নিজেদের বনভূমি সংরক্ষণ ও ব্যবহারের দায়িত্বও তারা পেয়েছে।

নেপালের বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের ২০২০ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ২৫ লক্ষ ৮০ হাজার হেক্টর বনভূমি কমিউনিটি ফরেস্ট হিসেবে স্থানীয় গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তবে কয়েকজন গবেষকের মতে, প্রত্যাশা অনুযায়ী বনভূমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, আয় তৈরি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেপালের কমিউনিটি ফরেস্টগুলি এখনও সফল হতে পারেনি।

বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণে নেপালের অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপর। প্রতি বছর বনে আগুন লাগা এবং প্রাকৃতিক জলস্রোত শুকিয়ে যাওয়ার মতো সমস্যার মুখে পড়ছেন তাঁরা। এর ফলে স্থানীয় মানুষের জলবায়ুজনিত ঝুঁকি আরও বেড়েছে, বিশেষত মহিলাদের।

এই পরিস্থিতিতে দুনা-টাপারি তৈরির মতো বনজ সম্পদনির্ভর উদ্যোগ, যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে, এই সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যাগুলির মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।

স্থানীয় বন-ব্যবহারকারী গোষ্ঠীর মহিলারা পরিবেশবান্ধব পাতার থালা তৈরির মাধ্যমে নিজেদের অনিশ্চিত অবস্থাকেই টেকসই জীবিকার সুযোগে বদলে দিচ্ছেন। তাঁদের এই উদ্যোগ একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশে অবদান রাখছে, পাতায় পাতায়।

(English) ভাষায় লিখেছেন Sanjib Chaudhary
(বাংলা) ভাষায় অনুবাদ করেছেন সৌম্যদীপ দেওয়ানজী
মূল লেখাটি দেখুন (English)