পশ্চিম আফ্রিকায় ১৮ বছরেই মেলে ভোটাধিকার, কিন্তু রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হতে অপেক্ষা করতে হয় আরও বহু বছর।
প্রথম প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে Global Voices বাংলা ভার্সন

আফ্রিকায় আন্দোলনে সামিল তরুণ সমাজ। ছবি: ডিডব্লিউ আফ্রিকার ইউটিউব চ্যানেল
পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলিতে ১৮ বছর বয়স হলেই প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ মেলে। কয়েকটি দেশে ২৫ বছর বয়স থেকেই সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া যায়। কিন্তু রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে দেশভেদে ৩৫, ৪০, এমনকি ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। বয়সের এই সীমা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করলেও, প্রকৃত সমস্যাগুলি থাকে প্রায়ই নির্বাচনী ব্যবস্থার আরও গভীরে লুকিয়ে।
রাজনীতির ছবিটা অনেকটা এমন। তরুণ সমাজ নিজেদের নেতা বেছে নেওয়ার মতো পরিণত, অথচ নিজেরা নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হয় না। ভোট দেওয়া, নিজেদের দাবিদাওয়া তুলে ধরা, প্রচার চালানো কিংবা প্রতিবাদে পথে নামার মাধ্যমে রাজনৈতিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যায় এই প্রজন্মই। অথচ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত। প্রশ্ন হল, যে গণতন্ত্র তরুণদের নেতা বেছে নেওয়ার অধিকার দেয়, কিন্তু নিজেরা নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ দেয় না, তাকে কি সত্যিই অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা যায়?
বয়সের বাধা কতটা বদলাচ্ছে?
পশ্চিম আফ্রিকার সব দেশেই ভোট দেওয়ার ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর। তবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার বয়সসীমা একেক দেশে একেক রকম। গাম্বিয়ায় এই বয়সসীমা ৩০ বছর। সেনেগাল, নাইজেরিয়া ও কোত দিভোয়ারে (আইভরি কোস্টে) ৩৫ বছর, আর বেনিন, ঘানা ও গিনিতে ৪০ বছর। আইনসভায় প্রার্থী হওয়ার বয়সসীমা আরও কম। টোগো, বেনিন, সেনেগাল এবং নাইজেরিয়ার প্রতিনিধি পরিষদে প্রার্থী হতে হলে অন্তত ২৫ বছর বয়স হতে হয়। ঘানায় এই সীমা ২১ বছর।
টোগোর পরিস্থিতিটি একটু খতিয়ে দেখা দরকার। ২০২৪ সালের ৬ মে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদীয় প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। ২০২৪ সালের সংবিধান অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার ন্যূনতম বয়স ৫০ বছর। এখন সংসদই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে এবং তাঁর ক্ষমতাও সীমিত। প্রকৃত নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে মন্ত্রী পরিষদের সভাপতির হাতে। এই পদে বসতে হলে অন্তত ৪০ বছর বয়স হতে হয়। সাধারণ মানুষের সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এই পদে নির্বাচন হয় না। ২০২৫ সালের ৩ মে থেকে এই পদে রয়েছেন ফাউরে গ্নাসিংবে। ওই দিনই সংসদ প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ৮৬ বছর বয়সি জ্যঁ-লুসিয়েন সাভি দ্য তোভে-কে নির্বাচিত করে। দেশটির ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব নিতে যাওয়া সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি তিনি।
তবে টোগোর আইন অনুযায়ী প্রার্থিতার বয়সসীমা যে অপরিবর্তনীয়, তা নয়। ২০০২ সালে জাতীয় সংসদে আইন সংশোধন করে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার ন্যূনতম বয়স ৪৫ থেকে কমিয়ে ৩৫ বছর করা হয়। বিরোধীরা এই সংস্কারকে ফাউরে গ্নাসিংবের জন্য বিশেষভাবে তৈরি বলে সমালোচনা করেছিল।
সম্প্রতি ঘানাতেও বয়সসীমা কমানোর উদ্যোগ দেখা গিয়েছে। ২০২৬ সালের ৩০ জুলাই রাজধানী আক্রায় দেশটির সরকার নীতিগতভাবে সম্মত হয় যে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার ন্যূনতম বয়স ৪০ থেকে কমিয়ে ৩৫ বছর করা হবে। সংবিধান পর্যালোচনা কমিটি অবশ্য ৩০ বছর করার সুপারিশ করেছিল। প্রস্তাবিত আইনটি শেষ পর্যন্ত গণভোটে তোলা হবে। সেই গণভোটে অন্তত ৪০ শতাংশ ভোটারের অংশগ্রহণ এবং ৭৫ শতাংশের সমর্থন প্রয়োজন।
২০১৮ সালে নাইজেরিয়া এই অঞ্চলে নজির গড়ে। তরুণ সমাজের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘নট টু ইয়ং টু রান’ (প্রার্থী হবার জন্য অপ্রাপ্তবস্ক নয়) আন্দোলনের চাপে আইন সংশোধন করে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার ন্যূনতম বয়স ৪০ থেকে কমিয়ে ৩৫ বছর করা হয়। প্রতিনিধি পরিষদে প্রার্থী হওয়ার বয়সসীমাও ৩০ থেকে কমিয়ে ২৫ বছর করা হয়।
ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতার ন্যূনতম বয়স কমালে সংসদেও তরুণ প্রতিনিধির সংখ্যা বাড়ে। তবে কোত দিভোয়ারের অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা। ২০১৬ সালে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৭৫ বছর তুলে দেওয়া হয়। এর পর ২০২৫ সালে ফের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে লড়েন ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতি আলাসান ওয়াতারা। তখন তাঁর বয়স ছিল ৮৩ বছর। আইন সব সময় যে তরুণ প্রজন্মের স্বার্থ রক্ষা করে, তা নয়।
রাজপথের আন্দোলনে তরুণদের সক্রিয়তা
মহাদেশজুড়ে তরুণদের ভোটাধিকার থাকলেও বাস্তবে সেই অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাঁদের অংশগ্রহণ কম। ২০২৫ সালের আগস্টে আফ্রোব্যারোমিটারের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সিরা রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রায় সব প্রচলিত ক্ষেত্রেই বয়স্কদের তুলনায় কম সক্রিয়। গোটা মহাদেশে ভোটদানের ক্ষেত্রে তরুণদের অংশগ্রহণ বয়স্কদের তুলনায় ১৮ শতাংশ পয়েন্ট কম। সেনেগালে এই ব্যবধান ২৯ শতাংশ পয়েন্ট, যা সর্বোচ্চ। একমাত্র প্রতিবাদের ক্ষেত্রেই ছবিটা আলাদা।
টোগোর রাজধানী লোমেতে র্যাপার আমরনের গ্রেপ্তারির প্রতিবাদে শুরু হয় ‘জুন ৬ আন্দোলন’। সেই আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামেন। মিডিয়া ফাউন্ডেশন ফর ওয়েস্ট আফ্রিকার তথ্য অনুযায়ী, এর পর আন্দোলন দমনে ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানো হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফেডারেশন এই দমন-পীড়নের জন্য সরকার-সমর্থিত মিলিশিয়াদের দায়ী করে। ঘটনায় সাতজনের মৃত্যু হয়।
মাদাগাস্কারেও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বিক্ষোভের জেরে রাষ্ট্রপতি অ্যান্ড্রি রাজোয়েলিনার সরকারের পতন ঘটে। এর পর সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপতি নিজেও ২০১৯ সালে একটি আন্দোলনের জেরে ক্ষমতায় এসেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৪ বছর।
একইভাবে কেনিয়ায় রাজপথের বিক্ষোভের চাপে সরকার ২০২৪ সালের অর্থ বিল প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে, মরক্কোয় তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভের পর কর্তৃপক্ষ তরুণ প্রার্থীদের উৎসাহ দিতে বিশেষ সুযোগের কথা ঘোষণা করে। পাশাপাশি আন্দোলনের নির্দিষ্ট কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
নেতৃত্বহীন আন্দোলন অনেক সময় সরকারের কাছ থেকে কিছু দাবি আদায় করতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক দল বা শ্রমিক সংগঠনের মতো সংগঠিত শক্তির সমর্থন না থাকলে সেই আন্দোলন সচরাচর দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
অংশগ্রহণ আছে, প্রতিনিধিত্ব কোথায়?
২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল প্রকাশিত ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা বিশ্বের সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৩০ বছর বা তার কম বয়সিদের সংখ্যা মাত্র ২.৮ শতাংশ। ২০২৩ সালের পর থেকে এই অগ্রগতি থমকে গিয়েছে। ২০১৪ সালের পর এই প্রথম এমনটা ঘটল। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি (৩৭.১ শতাংশ) আইনসভায় এই বয়সের কোনও সংসদ সদস্যই নেই।
তরুণ সমাজের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বের এই অভাব বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ, ওয়েস্ট আফ্রিকা ইয়ুথ ডেমোক্রেসি কনফারেন্সের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম আফ্রিকার জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে।
ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ঘানার ২০২৫ সালের সংসদের মেয়াদ শুরু হওয়ার সময় ৩০ বছর বা তার কম বয়সি কোনও সংসদ সদস্য ছিলেন না। অথচ দেশে সংসদ সদস্য হওয়ার ন্যূনতম বয়স ২১ বছর। ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সিদের হাতে ছিল ২৬৯টি আসনের মধ্যে মাত্র ৪৬টি, অর্থাৎ ১৭.১ শতাংশ। সেনেগালের ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদে ৩০ বছরের কম বয়সি সদস্য ছিলেন মাত্র পাঁচজন, মোট সদস্যের মাত্র ৩ শতাংশ। অথচ নথিভুক্ত ভোটারদের প্রায় ৩৮ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। সংসদ সদস্যদের গড় বয়স ছিল ৪৭ বছর। মাত্র ৪৪ বছর বয়সে নির্বাচিত হয়ে দেশের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হন বাসিরু দিয়োমায়ে ফায়ে। তাঁর রাজনৈতিক পরামর্শদাতা ওসমান সোনকো প্রার্থিতার অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার পরেই তিনি রাষ্ট্রপতি পদে আনুষ্ঠানিক প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পান।
নাইজেরিয়ার ক্ষেত্রে ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়া, বিশ্বজুড়ে টেকসই গণতন্ত্রকে সহায়তা করা একটি আন্তঃসরকারি সংস্থা, জানিয়েছে, ২০১৫ সালে প্রতিনিধি পরিষদের ৩৬০ জন সদস্যের মধ্যে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সি সদস্য ছিলেন মাত্র তিনজন। ২০১৯ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে হয় ১৪। অগ্রগতি হলেও তা এখনও সামান্য।
ডাকারে ‘নট টু ইয়ং টু রান’ আন্দোলনের নেপথ্যে থাকা সংগঠন ইয়াগা আফ্রিকার প্রধান বিষয়টি সংক্ষেপে তুলে ধরেন। তাঁর কথায়, কাগজে-কলমে রাজনৈতিক পরিসর যতটা উন্মুক্ত, বাস্তবে তা ততটা নয়।
তবে আফ্রোব্যারোমিটার একটি বৈপরীত্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তরুণ সমাজ বয়স্কদের তুলনায় কম ভোট দিলেও, ক্ষমতার আসন ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত। প্রতিনিধিত্বের এই ঘাটতি নিছক নিষ্ক্রিয়তার ফল নয়; বরং তা রাজনীতি থেকে তরুণ প্রজন্মকে দূরে সরিয়ে দেয়। ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের সতর্কবার্তা, সংসদে তরুণদের অনুপস্থিতি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল করে এবং গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থাকে বিপন্ন করে। ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর যে দেশগুলির সংসদে তরুণ সদস্যের সংখ্যা বেড়েছে, সেনেগাল তাদের অন্যতম। অর্থাৎ, কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি যখন একটি প্রজন্মকে ক্ষমতায়নের সুযোগ দেয়, তখন সংসদে প্রজন্মগত পরিবর্তন সম্ভব।
নিয়ম বদলের লড়াই: অর্থ, রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য বাধা
বয়সসীমা বেশি রাখার পক্ষের যুক্তি, নেতৃত্ব দিতে অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। আফ্রোব্যারোমিটার ৩৪টি দেশে সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছে, নাগরিকেরা গড়ে ৩৯ বছর বয়সি নেতৃত্ব পছন্দ করেন। অন্যদিকে, বয়সসীমা কমানোর পক্ষের মানুষেরা তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে বাস্তব পদক্ষেপ চান। যেমন, প্রার্থী হওয়ার ন্যূনতম বয়স কমানো, তরুণদের জন্য আসন সংরক্ষণ এবং তরুণ সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষ আলোচনামঞ্চ তৈরি করা। তবে নাইজেরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, অনেক সময় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় অর্থ।
নাইজেরিয়ার শাসক দল অল প্রগ্রেসিভস কংগ্রেস ২০২৭ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের প্রার্থী হওয়ার জন্য আগ্রহপত্র ও মনোনয়নপত্রের মোট মূল্য ধার্য করেছে ১০ কোটি নাইরা (৭৫,০০০ মার্কিন ডলার)। এর মধ্যে আগ্রহপত্রের মূল্য ৩ কোটি নাইরা (২২,৫২১ ডলার) এবং মনোনয়নপত্রের মূল্য ৭ কোটি নাইরা (৫২,৫৫০ ডলার)। সিনেট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য লাগবে ২ কোটি নাইরা (১৫,০১৪ ডলার), আর প্রতিনিধি পরিষদের জন্য ১ কোটি নাইরা (৭,৫০৭ ডলার)।
তরুণ প্রার্থীদের জন্য ছাড় থাকলেও তা কেবল মনোনয়নপত্রের মূল্যে। সেখানে ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হবে। ফলে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে তাঁদেরও মোট ৬ কোটি ৫০ লক্ষ নাইরা (৪৮,৭৮৯ ডলার) খরচ করতে হবে। নাইজেরিয়ার একটি নাগরিক সমাজ সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, মাসে ন্যূনতম মজুরি ৭০,০০০ নাইরা (৫২ ডলার) উপার্জন করেন এমন একজন কর্মীকে এই মনোনয়নপত্র কেনার জন্য এক শতাব্দীরও বেশি সময় কাজ করতে হবে।
২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারে খরচের সর্বোচ্চ সীমাও দ্বিগুণ করে ১০০০ কোটি নাইরা (৭৫ লক্ষ মার্কিন ডলার) করা হয়েছে। রাজ্যপাল পদপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই সীমা তিন গুণ বাড়িয়ে ৩০০ কোটি নাইরা (২২ লক্ষ মার্কিন ডলার) করা হয়েছে।
পশ্চিম আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলির অর্থনৈতিক জোট এবং তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত অধিকার আদায়ের সংগঠন লেজিস৩৬০-এর উদ্যোগে এই বাধাগুলি নিয়ে আলোচনা করতে ১২টি দেশের প্রতিনিধিরা ডাকারে একত্রিত হন। তাঁদের যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা পশ্চিম আফ্রিকা যুব নির্বাচন পর্যবেক্ষক নেটওয়ার্ক গঠনের ঘোষণা করেন। পাশাপাশি, তরুণদের জন্য আসন সংরক্ষণ, প্রার্থীদের মনোনয়ন ফি কমানো এবং নির্বাচনী প্রচারের খরচের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণের দাবি জানান। পরে পশ্চিম আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলির অর্থনৈতিক জোট ঘোষণা করে, ২০২৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নাইজেরিয়ার আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তারা শুধু তরুণ পর্যবেক্ষকদের নিয়ে গঠিত একটি নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে।
অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, আইন পরিবর্তন করেও প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব ফেলা সম্ভব। ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের মতে, ২০২২ সালে ইকুয়েডারে চালু হওয়া একটি আইন দেশটির অগ্রগতির অন্যতম কারণ। সেই আইনে নির্বাচনে প্রার্থীদের অন্তত ২৫ শতাংশ তরুণ হওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। যেসব দেশে জনপ্রতিনিধিদের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদসীমা রয়েছে, সেসব দেশের সংসদেও তরুণ সদস্যের সংখ্যা বিশ্ব গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০২৩ সালে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন আরও জানিয়েছিল, তরুণ প্রার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত অর্থের অভাব এবং নির্বাচনী প্রচারের খরচের ঊর্ধ্বসীমা না থাকাও সংসদে বয়স্ক প্রতিনিধিদের আধিক্যের অন্যতম কারণ।
অন্যদিকে, কিছু দেশে বাধাগুলি রাজনৈতিক। উদাহরণ হিসেবে বেনিনের কথা বলা যায়। নির্বাচনী শর্ত পূরণ করতে না পারায় প্রধান বিরোধী দল লে দেমোক্রাতের প্রার্থীকে প্রার্থিতার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। ফলে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতি রোমুয়াল্ড ওয়াদাগনির প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মাত্র একজন, পল হুনকপে। ২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ওয়াদাগনি ৯৪.২৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। ২০২৪ সালের একটি সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে সাত বছর করা হয়। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদে আসন পেতে সংসদ নির্বাচনে ন্যূনতম ভোটের হার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। কোনও প্রার্থীর পাশে শক্তিশালী দলীয় সংগঠন না থাকলে, তাঁর বয়সের চেয়ে এই নিয়মকানুনই অনেক বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
আরেকটি উদাহরণ বুরকিনা ফাসো। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেশটির সামরিক জান্তা সব রাজনৈতিক দল ভেঙে দেয়। অন্যদিকে, গাম্বিয়ার রাষ্ট্রপতি আদামা ব্যারো ৫ ডিসেম্বরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তৃতীয়বারের জন্য প্রার্থী হতে চলেছেন।
ভোটে অন্তর্ভুক্তি, প্রতিনিধিত্বে ঘাটতি
যে ব্যবস্থায় তরুণ সমাজ নিজেদের নেতা নির্বাচনের অধিকার পায়, অথচ নিজেরা নেতা হওয়ার পথে বাধার মুখে পড়ে, তাকে কি পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা যায়? পরিসংখ্যানই এই প্রশ্নের উত্তর দেয়। নাইজেরিয়া প্রার্থিতার বয়সসীমা কমিয়েছে, ঘানাও একই পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু বয়সের সীমাবদ্ধতা আসলে সমস্যার কারণের চেয়ে তার একটি লক্ষণ মাত্র। একমাত্র বয়সই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী নয়।
সমালোচকদের মতে, প্রার্থিতার বয়সসীমা কমালেই সমস্যার সমাধান হবে না। মনোনয়নের খরচ, রাজনৈতিক দলের নিয়মকানুন এবং রাজনৈতিক পরিসর কতটা উন্মুক্ত, এসব বিষয়ের পরিবর্তন না হলে তা হবে অন্তহীন সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখা মাত্র। তরুণ প্রজন্মের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় পৌঁছনোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিপুল খরচ, মনোনয়নের কঠোর নিয়ম, প্রার্থীদের অযোগ্য ঘোষণা এবং এমনকি রাজনৈতিক দলের অভাবও।
রাজপথের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণ সমাজ যত দিন না বিশ্বাসযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পাচ্ছে, তত দিন আন্দোলনের মাধ্যমে আদায় করা সাফল্য সাময়িকই থেকে যাবে। মাদাগাস্কারের মতো ক্ষেত্রে আবার সেই আন্দোলনের পর ক্ষমতায় এসেছে এমন শক্তি, যাদের আগমন আন্দোলনকারীরা চাননি। পশ্চিম আফ্রিকার গণতান্ত্রিক চুক্তির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, তরুণদের শুধু রাজনীতির প্রতিশ্রুত ভবিষ্যৎ হিসেবে নয়, আজকের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বেরও সক্রিয় অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।





